“এই কবিতার কোন শিরোনাম নেই” – আয়শা আহমেদ

“তোমার জন্য কবিতায় ফোঁটাব কয়েক লক্ষ কৃষ্ণচূড়া।”

বলিষ্ঠ কণ্ঠের আবৃত্তিতে, আমি ধড়ফড় করে জেগে ওঠি মৃত্যুর নেশা ভেঙে,
বুক ছেড়ে খসে পড়া সুতির আঁচল; আর
কপাল ভাসা চুলের ঢেউ বেয়ে,
আমার দৃষ্টিবরাবর উঠে আসে আপনার ক্ষুরধার দৃষ্টি,
আমি খুন হয়ে যাই!

আমি ফিরে যাই,
আমি ফিরে যাই সেইসব ক্লাসপালানো ষোড়শী প্রেমের দিনগুলোতে –
চারিদিকে ভরা বসন্ত,
ডালে ডালে, কৃষ্ণচূড়ায় উথালপাথাল ফাগুন।
কৃষ্ণচূড়ার লাল-সবুজে ছাদ
আর লাল পাঁপড়ির গালিচায় শরীর মেলে,
আমাকে আপনি করে নিতেন শান্তিদায়ী সিঁথান।
অথচ তখন
আমার চিবুক ছুঁয়ে আপনার শাব্দিক প্রেম,
ছন্নছাড়া আবেগের পশরা আমি বুঝি না,
আমি কবিতা বুঝি না!
শব্দের হৃদয় মোড়া কাগজ হেলায় ফেলে,
আমার তখন শুধু কৃষ্ণচুড়া চাই।

তারপর একটা অভিমানি বিকেল –
শিমুলতলী মোড়ের রমা বৌদির চায়ের দোকানী কাপে;
নতুন লেখা গানের সুরে, আপনি আমাকে মিশিয়ে দিলেন অবলীলায়।
অথচ তখনো, কলেজ ইউনিফর্মে টাটকা লেগে আছে
আমার ছোপ ছোপ অবুঝ কান্না।
আর, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়িক প্রেম
ক্রমেই আবর্তিত হচ্ছে আমার ছেলেমানুষি খোঁপার প্যাঁচে,
আর আমার অভিমানি কান্না,
আড়াল খুঁজে চলেছে একথোকা দূর কৃষ্ণচুড়ায়।

হঠাৎ!
একদিন আপনি সূর্যের মত উদয় হলেন,
টকটকে লাল কৃষ্ণচচূড়ার ডালে হাস্যোজ্জ্বল হৃদয় নিয়ে।
আমি মোম হয়ে গেলাম!
কৃষ্ণচুড়ার লালে নয়,গলে গেলাম আপনার হাসির আঁচে।
আপনার জানা হলোনা,
আপনার জানা হলোনা আমি কতোতম বার খুন হলেম, আপনাতে!

“এখনো বুঝি কৃষ্ণচুড়ার ভালোবাসো?”

আবার সেই পাগল করা কণ্ঠস্বর!
কাজলের লেপ্টালেপ্টি কারুকাজ আরেকটু বাড়িয়ে
উদভ্রান্তের মত ঘরময় খুঁজে বেড়াই আপনাকে,
অথচ আপনি এখানে নেই!
অথচ আমি কবিতা বুঝি ,তারচে বেশি বুঝি আপনাকে,
আপনার প্রতিটি বর্ণের প্রেম, এখন আমায় বড্ড পোড়ায়।
আরেক লাইন কবিতা শোনাবেন?
কোথায় চলে গেলেন কবি!

“অঙ্কে তুমি বড্ড কাঁচা,
আমার কবিতার হিসেব লাইন পেরিয়ে গ্যাছে কব্বে!
এক ফাগুনে,
রাজপথে ফুটেছিলাম রক্তলাল কৃষ্ণচূড়া হয়ে;
সেই থেকে তুমি কবিতা বোঝ!
আর আমার কবিতারা
শব্দ পেরিয়ে এখন রক্ত মাংসের দেবী, তোমাতে!
জানো?
আমি আজও কবিতায় বাঁচি, জলজ্যান্ত কবিতায়।”

বিদায়ী সুর কণ্ঠে ঢেলে, মিলিয়ে গেলেন আপনি,
সদ্য ঘুম অথবা মৃত্যু ভাঙা আমার ঘর্মাক্ত বুকে এখন বড্ড তেষ্টা।
জানালা পেরিয়ে দৃষ্টির সীমান্তে জ্বলে কৃষ্ণচুড়ার আগুন।
আমি পুড়ে যাই,আমি খুন হয়ে যাই,
কৃষ্ণচুড়া হাতে আরেকটিবার
আপনার সেই কৃষ্ণচূড়া হাসি দেখবার তেষ্টায়
আমি জ্বলে পুড়ে মরে যাই সহস্র বার।

তবুও
ফিরতি সাঁঝবাদলের স্নানঘরে, ধুয়ে যায় আমার শাড়ির বিষাদের রং,
বিজলির চমকে ফুটে ওঠে আঁচলের লাল।
আরেকটু জড়িয়ে যান আপনি, আমাতে!
আমার সিঁথিময় শূণ্যতায়
দুপুরমনি ফুলের সুশ্রী বিষাদের মত দাহ্য আপনাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে
জন্ম নেয় আরেকটি কবিতা অথবা মৃত্যুর,
যার শিরোনাম- “বেঁচে থাকা!”

Agami Soft. - Inventory Management System

পাঠকের মতামত