লক্ষ্মীপুরের সেচ প্রকল্পে গাফিলতি : ৭০ একর জমি অনাবাদি

ছবি: লক্ষ্মীপুরের সেচ প্রকল্পগুলো।

একদিকে নির্মাণ হচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) সেচ প্রকল্প। অন্যদিকে প্রকল্পের আওতায় থাকা কৃষি জমির মাটি চলে যাচ্ছে ইটভাটায়। আর সঠিক সময়ে প্রকল্প চালু করতে না পেরে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ কৃষকরা। ফলে কৃষির উন্নয়ন না হলেও উন্নয়ন হচ্ছে মাটি দস্যু এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সেচ ম্যানেজারের।

এমন চিত্র লক্ষ্মীপুর জেলার সদর উপজেলার মান্দারী ইউনিয়নের রতনপুর এবং পাশ্ববর্তী দত্তপাড়া ইউনিয়নের নরসিংহপুর গ্রামে। এতে ওই এলাকায় বিএডিসির আওতাধীন দুইটি প্রকল্পের প্রায় শতাধিক কৃষকের ৭০ একর ফসলি জমি বোরো আবাদ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। চলতি অর্থ
বছরে এই দুইটি প্রকল্পে সরকারের ব্যয় হয়েছে অর্ধলক্ষাধিক টাকার ওপরে।

এদিকে সঠিক সময়ে প্রকল্প চালু না হওয়ায় কৃষকরা দায়ি করছেন প্রকল্প ম্যানেজারকে। আর প্রকল্প ম্যানেজার দায়ি করছেন বিদ্যুৎ বিভাগকে। বিদ্যুৎ বিভাগ দায়ি করছেন বিএডিসিকে। বিএডিসি পাল্টা দায়ি করছেন বিদ্যুৎ সরবরাহে নিয়োজিত পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে।

জানা গেছে, সদর উপজেলার মান্দারী ইউনিয়নের রতনপুর গ্রামের বিএডিসি’র ‘আক্তার সেচ প্রকল্প-১’র আওতাধীন কৃষি জমি রয়েছে প্রায় ৫০ একর। এ বছরে ওই প্রকল্পে থাকা প্রায় ৩০ একর জমিতে বোরো ধানের চারা রোপন করা হয়েছে। বাকী প্রায় ২০ একর জমি অনাবাধি রয়ে গেছে। প্রকল্পের সভাপতি সহিদ নামে স্থানীয় এক কৃষক। আর আক্তার হোসেন নামে এক ব্যাক্তি হলেন ওই প্রকল্পের ম্যানেজার। কিন্তু তিনি কৃষক নন।

শুক্রবার বিকেলে সরেজমিনে ওই প্রকল্প ঘুরে দেখা গেছে, প্রকল্পে আওতাধীন জমির মাটি কেটে নিচ্ছে একটি সিন্ডিকেট। প্রকল্পের সেচ পাম্পের কাছেই থাকা জমি থেকে মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ইটভাটাতে। কিন্তু ওই জমিতে গত কয়েকদিন আগেই বিএডিসির প্রকল্পের পাইপ লাইন নির্মাণ করা হয়েছে।

কিছু দূর গিয়ে দেখা যায়, জমি তৈরী এবং চারা রোপন করছেন কৃষকরা। এ সময় তাদের সাথে কথা হয় বিডি৩৬০ নিউজের প্রতিবেদকের সাথে। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রকল্প ম্যানেজারের প্রতি। কৃষক দীন মোহাম্মদ জানান, পানির অভাবে সঠিক সময়ে তিনি জমিতে চারা রোপন করতে পারেননি। ফলে চারার বয়স বৃদ্ধি হয়ে চারাগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এ চারা লাগিয়ে আশানুরুপ ধান উৎপাদন সম্ভব হবেনা।

পাশের একটি জমি দেখিয়ে তিনি বলেন – ওই জমিতে পুরনো পানি থাকায় গেল এক মাস আগে চারা লাগিয়েছি। একই সাথে যদি সব জমিতে চারা লাগানো যেত, তাহলে ধানের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা ছিলো। একই প্রকল্পের কৃষক শামছুল আলম এবার বোরো চাষ থেকে বিরত ছিলেন।

তিনি বলেন – বিদ্যুতের কারণে খেতে সঠিক সময়ে পানি না দেওয়ায় জমি তৈরী করা যায়নি এবং চারা লাগানো সম্ভব হয়নি। ফলে তার ধানের চারা সব নষ্ট হয়ে গেছে। তাই চলত মৌসুমে তিনি ৮৪ শতাংশ জমি অনাবাদি রেখেছেন। আরেক কৃষক সিরাজ মিয়া বলেন, আমি নিজ দায়িত্বে আমার ৪০ শতাংশ জমিতে পানি সেচ দিয়ে চারা লাগিয়েছি।

তিনি আরো বলেন – কয়েকদিন আগে জমিতে পানি শুকিয়ে গেলে প্রজেক্ট ম্যানেজার আক্তারকে পানি দিতে বলি। কিন্তু সে পানি দিতে দিরী হবে বলে জানিয়ে দেয়। তাই নিজ খরচে পুনরায় পানি সেচ করেছি। সরকারী প্রকল্প আমাদের কোন কাজেই আসছে না। ধান কাটার সময় প্রকল্প ম্যানেজার কৃষকের কাছ থেকে ঠিকই পানি বাবদ অর্থ আদায় করে নিবে।

প্রকল্পটির পাশেই দত্তপাড়া ইউনিয়নের নরসিংহপুর গ্রামে রয়েছে ‘আক্তার সেচ প্রকল্প-২’। ‘২ কিউসি’ এই প্রকল্পের পাইপ লাইন এবং সেচকৃত পানির ‘হাউজ’ এরই মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে। আর বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য খুঁটি স্থাপন করা হলেও স্থানীয় একটি বাধার কারণে ক্যাবল টানা সম্ভব হয়নি। ফলে অনাবাদি রয়ে গেছে ওই প্রকল্পের আওতায় থাকা প্রায় ৪০ একর জমি।

প্রকল্পের আওতাধীন জমি থেকে মাটি কেটে সরবরাহ করা হচ্ছে ইটভাটায়। ওই প্রকল্পের সভাপতি হলেন স্থানীয় কৃষক আবুল কাশেম। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন – প্রকল্প ম্যানেজার আক্তার আমাকে নামমাত্র সভাপতি বানিয়েছেন। তিনি অকৃষক ও দায়িত্বহীন একজন লোক। তার আন্তরিকতার অভাবে এ প্রকল্প এবার অনাবাদি রয়ে গেছে। তার নিজ উদ্যোগে জমিতে সেচ পাম্পের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করলে জমিগুলো অনাবাদি থাকতো না এবং কৃষকও ক্ষতিগ্রস্ত হতো না।

এ ব্যাপারে আক্তার সেচ প্রকল্প- ১ ও ২ এর ম্যানেজার মো. আক্তার বিডি৩৬০ নিউজকে বলেন – প্রকল্প-১ এর লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন বৈদ্যুতিক মিটার এখনো পাইনি। আগের বৈদ্যুতিক মিটার দিয়ে সেচ কার্য চালিয়ে যাচ্ছি। এছাড়া প্রকল্পের পাইপ লাইন নির্মাণ করতে সময় লেগেছে। আর খালে পানি না থাকায় সেচকার্য ব্যাহত হচ্ছে। তাই ঠিকমতো পানি দিতে পারছি না। প্রকল্প-২ এর বিষয়ে তিনি বলেন – স্থানীয় বাধার কারণে সেখানে বিদ্যুৎ লাইন চালু করা যাচ্ছে না। ফলে প্রকল্পটি এবার বন্ধ রয়েছে।

বিএডিসির লক্ষ্মীপুর জোন এর সহকারী প্রকৌশলী (সেচ) মো. আবদুর রাজ্জাক বিডি৩৬০ নিউজকে বলেন – বিএডিসির সেচ প্রকল্পে বৈদ্যুতিক লাইন পেতে সময় লেগে যাচ্ছে। এ বিষয়ে বার বার বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে অনুরোধ কোন কাজ হয়নি। আক্তার সেচ প্রকল্পের বিষয়ে তিনি জানান, প্রকল্প-১ এর মিটার এখনো লাগেনি। আর প্রকল্প-২ এর লাইনে বাধা থাকার কারণে নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। প্রকল্প ম্যানেজারের বিরুদ্ধে কৃষকের আনা অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি তাৎক্ষণিক ম্যানেজারকে সতর্ক করে দেন।

লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আবু তাহের বলেন – সমিতির দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে বদ্ধপরিকর। সেচ প্রকল্পে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য আবেদন করলে কার্য সম্পাদন, লাইন নির্মাণ এবং মিটার সংযোগ পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময় প্রয়োজন। তাই আবেদন দেরীতে করলে বিদ্যুৎ সংযোগ দেরীতেই পাবে। তিনি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন করার অনুরোধ জানান সেচ সংশ্লিষ্টদের প্রতি।

#মো: রবিউল ইসলাম খান, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি।

Agami Soft. - Inventory Management System

পাঠকের মতামত