২০১৯ : যাদের চলে যাওয়ার পেছনে আমরা দায়ী

২০১৯ সালের আলোচিত কিছু স্থিরচিত্র।

আর মাত্র ২ দিন! এরপর পুরনো সূর্যটি আবারও নতুন আলো হয়ে পূর্ব আকাশে উদিত হবে। এরই মধ্যে পুরনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণ করে নিতে ঢালা সাজানোয় ব্যস্ত সারাবিশ্বের মানুষ। নতুন বছর নতুনভাবে বাঁচতে শেখাবে সেই আশা বুকে নিয়ে বরণ করে নিবে সানন্দে।

এই ২০১৯ সালটি আমাদের ভোলার নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে এই বছরটি আমাদের সবার মনে থাকবে। রাজনীতি-দুর্নীতি, বিনোদন-ভ্রমণ, আক্ষেপ-আকুতি সব মিলিয়ে এই বছরটি সবার মনে রাখার মত কিছু অভিজ্ঞতা দিয়ে গেছে। হারানোর বেদনার সাথে পাওয়ার আনন্দও এই বছরটি দিয়ে গেল।

এবছর টেলি সামাদ, সুবীর নন্দী, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবলের মত কিছু বরণীয় মানুষকে হারিয়েছি আমরা। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, সাদেক হোসেন খোকার মত শক্তিশালী রাজনীতিবিদের জীবনাবসান হয়েছে এই বছরটিতে। পাঁচমিশালী এই বছরে আক্ষেপ করা মতও কিন্তু আছে।

রিফাত, নুসরাত বা আবরার! এই নামগুলি এই বছরের আক্ষেপ হিসেবে থেকে যাবে আজীবন। গুজবের বলী হওয়া দুই সন্তানের মা তাসলিমার কথাইবা কিভাবে ভুলে থাকবো আমরা। শিশু ধর্ষণের রেকর্ড হয়েছে এই বছর। বছরের শেষে এসে নতুন নাম এল ‘রূম্পা’। এদের নিয়েই আজকের কথামালা।

নুসরাত হত্যা মামলা: ৬ এপ্রিল, ২০১৯; সারাদেশে তখন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা মাত্র শুরু হল। ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় সেদিন মনে হয় বাংলা পরীক্ষা ছিল। আর বাকী সব ছাত্রীর মত নুসরাত জাহান রাফিও পরীক্ষা দিতে এসেছিলো। কিন্তু তার পরীক্ষা দেওয়া আর হলো না।

লম্পট অধ্যক্ষ এস এম সিরাজদ্দৌলার কুপ্রস্তাবে রাজি না হয়ে শ্লীলতাহানীর মামলা করায় মাদ্রাসার ছাদে নিয়ে গায়ে আগুন ধরিয়ে দিল নুসরাতের। আর এতে সাহায্য করেছে, নুর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন, উম্মে সুলতানা পপির মত সিরাজদ্দৌলার পালিত কিছু সন্ত্রাস। টানা ৪ দিন জীবনের সাথে যুদ্ধ করে ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুবরণ করে বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে নুসরাত জাহান রাফি।

নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার প্রতিবাদে ফেনীসহ সারাদেশের শিক্ষার্থীরা তুমুল আন্দোলনে নেমে পড়ে। “শিক্ষাঙ্গনে যৌন হয়রানী”র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করে দেয়। সারাদেশের মানুষে প্রতিবাদের মুখে ১৬ জনকে গ্রেফতার করে আদালতে দাঁড় করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরবর্তীতে মহামান্য আদালত ১৬ জন আসামীকেই মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।

রিফাত হত্যা: ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৯ সালের ২৬ জুন। বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে সেদিন সত্য ঘটনা অবলম্বনে সিনেমার শ্যুটিং হয়েছিল। ৩-৪ জনের একটি সন্ত্রাস বাহিনী একটি ছেলেকে এলোপাতাড়ি কোপাচ্ছে, ছেলেটিকে বাঁচাতে তার স্ত্রী প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে! আশেপাশের মানুষগুলো সেই  শ্যুটিং খুব উপভোগ করেছিল। শ্যুটিং শেষে পুলিশ আসলো আর জিজ্ঞাসাবাদ করে চলে গেল।

এই ঘটনার ভিকটিম হলো শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফ। সেদিন রিফাতের উপর নির্মমভাবে অস্ত্র চালিয়েছিল নয়ন বন্ড, রিফাত বন্ডসহ আরো কিছু সন্ত্রাস। নিজের স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করা স্ত্রী হলেন আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। পরে সেই মিন্নিই স্বামীর হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে গ্রেফতার হন। কয়েকদিন হাজতে থাকার জামিনে মুক্তি পেয়ে এখন শুধু হাজিরা দিচ্ছেন মিন্নি।

রিফাত হত্যার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড। গ্রেফতার হওয়ার সময় পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। এছাড়া, রিফাত শরীফ হত্যা মামলার বাকী মূল আসামিদের সবাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রিফাত শরীফ হত্যা মামলার অন্যতম আসামিরা হলেন- রিশান ফরাজী, টিকটক হৃদয়, রিশান ফরাজীর ভাই রিফাত ফরাজী।

গুজবের বলী হলেন দু’সন্তানের মা: একটি ‘গুজব’ সারা জীবনের কান্না; এমন কথাটি প্রমাণিত হয়েছে ২০ জুলাই। চাকুরিজীবী এক মা নতুন বাসা নিয়ে থাকতে শুরু করলেন ফার্মগেটের ওয়্যারলেসে। বছরের মাঝখানে বাসা পরিবর্তন করায় দুই সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করানো নিয়ে পড়লেন বিপত্তিতে। তাই বের হলেন স্কুল খুঁজতে, ছেলে-মেয়েকে স্কুলের ভর্তি করানোর তাগিদ কেঁড়ে নিল তাসলিমা বেগম রেনুর জীবন।

বছরের মাঝে একটি গুজবে সরব ছিল সারাদেশ। পদ্মাসেতু তৈরি করতে ১ লাখ শিশুর মাথা লাগবে। তাই মাথা সংগ্রহ করতে ‘কল্লাকাটা’ নেমেছে রাস্তায়। এই গুজবে কান দিয়ে মানুষ যেন হিংস্র পশু হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির আশেপাশে অপরিচিত পাগল বা সন্দেহজনক মানুষ দেখলেই ‘কল্লাকাটা’ বলে বেদম প্রহার করে আধমরা করে ফেলতো।

এমনই একদিনে বাড্ডার একটি স্কুলে মা তাসলিমা গিয়েছিলেন বাচ্চার ভর্তির ব্যাপারে কথাবার্তা বলতে। কিন্তু সেখানে অন্য শিক্ষার্থীদের এক অবিভাবক ‘কল্লাকাটা’ বলে চিৎকার শুরু করলে আশেপাশের মানুষ এসে তাসলিমাকে ঘিরে ধরে। প্রাণ বাঁচাতে তাসলিমা ঢুকে যান প্রধান শিক্ষকের কক্ষে। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি তার। চুল ধরে টেনে-হিঁচড়ে বের করে এনে রড দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলে তাসলিমাকে।

জাবালে নূর কাণ্ড: ২০১৯ সালের সবথেকে আলোচিত বিষয় হচ্ছে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন। এর সূত্রপাতও অবশ্য একটি মর্মন্তিক দুর্ঘটনা দিয়ে শুরু হয়েছিল। ২৯ জুলাই দুপুরে রাজধানীর হোটেল র‍্যাডিসনের বিপরীত পাশের জিল্লুর রহমান উড়ালসড়কের ঢালের সামনের রাস্তার ওপর জাবালে নূর পরিবহনের তিনটি বাস রেষারেষি করতে গিয়ে একটি বাস রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের ওপর উঠে পড়ে।

এতে দুই শিক্ষার্থী নিহত ও ৯ জন আহত হয়। নিহত দুই শিক্ষার্থী হলো দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম রাজীব (১৭) ও একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মিম (১৬)। এ ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী দিয়া খানমের বাবা জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন।

এদিকে, এই দুর্ঘটনার পর রাস্তায় নেমে পড়ে রমিজ উদ্দিনের শিক্ষার্থীসহ রাজধানীর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। রাস্তায় নেমে কোনো ভাঙচুর বা কোনো ধরণের অরাজগতার সৃষ্টি করেনি শিক্ষার্থীরা। তারা শুধু দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে সড়ক নিরাপদ রাখতে হয়। রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলতে দেয়নি কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।

লাইসেন্স চেক করা থেকে শুরু করে সকল ট্রাফিক রুলস সঠিকভাবে প্রয়োগ করা দেখিয়ে দিয়েছে তারা। এই আন্দোলনেই বাংলাদেশের মানুষ মহাসড়কে প্রথমবারের মত ‘ইমার্জেন্সি রোড’ দেখেছে। শিক্ষার্থীদেরকে পুর্ণ সমর্থন দিয়েছিল অবিভাবক থেকে শুরু করে সারাদেশের মানুষ। টানা ১০ দিনের এমন ব্যতিক্রমী আন্দোলনের মুখে পড়ে জাবালে নূর বাস নিষিদ্ধ করে বিআরটিসি।

বুয়েটের আবরার হত্যা: বাংলাদেশের সেরা বিদ্যাপীঠের একটি হচ্ছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। বলা হয়ে থাকে বুয়েটে বাংলাদেশের প্রথম সারির মেধাবী শিক্ষার্থীরা পড়ে। কিন্তু কিছু মেধাবীও যে নরপিশাচ হতে পারে এটা দেশের মানুষ দেখেছে ২০১৯ এর ৭ অক্টোবর। সেদিন গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত শেরে বাংলা হলের ২০১ নম্বর কক্ষে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে।

নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই কয়েকজন সিনিয়র ভাইয়ের র‍্যাগিংয়ের শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে আবরারকে। আবরার ফাহাদের মৃত্যুতে আবারও জেগে উঠেছিল শিক্ষার্থীরা। ১১ দফা দাবি তুলে তারা ক্লাস বর্জন করে। সন্দেহ করা হয়েছিল আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করার পিছনে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত কয়েকজন শিক্ষার্থীদের হাত আছে। পরবর্তিতে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়ে তাদেরকে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয়।

এরপর আবরার ফাহাদের বাবা ১৯ জনকে আসামি করে একটি মামলা করে। মামলার প্রেক্ষিতে, ১৯ জনকেই আদালতে তোলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, আবরার ফাহাদকে কয়েক দফা মারের ফলে তার মৃত্যু হয়েছে। পরবর্তিতে পুলিশ এর সাথে ২৯ জনের সম্পৃক্ততা খুঁজে পায়। এ পর্যন্ত আবরার হত্যা মামলায় ২১ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এরমধ্যে দুইজন এখনো পলাতক রয়েছে।

#শুভ আহম্মেদ, বিডি৩৬০ নিউজ।



চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এবং পাশাপাশি সকল চাকরির প্রস্তুতি প্রকাশ করা হয়। এছাড়া দিনের ব্রেকিং নিউজ সবার আগে পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন:facebook-button-join-group

সরকারি এবং বেসরকারি চাকুরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পেতে

facebook-button-join-group

Agami Soft. - Inventory Management System

পাঠকের মতামত