নেপথ্যে মানবাধিকার দিবস: দেখে নিন মানুষের মাঝে কত মানবতা

মানবতা, মানবাধিকার এ শব্দগুলো মানবসভ্যতার মাপকাঠির নির্ধারক হলেও আজকের বিশ্বে একেবারেই বেমানান। স্বার্থ আর বিভেদের কাছে এসব শব্দ আজ অবহেলিত। ‘মানবাধিকার’ এই শব্দটি দ্বারা কোনো দেশে জন্মগ্রহণকারী কোন শিশুর প্রাপ্য অধিকারকে বোঝায়। এই প্রাপ্য অধিকারের সংজ্ঞা আবার মানুষ থেকে মানুষ ভিন্ন হয়ে থাকে। পৃথিবীতে জন্মগ্রহণের পর থেকে বেড়ে ওঠার বিভিন্ন পর্যায়ে একজন মানুষ এই অধিকারগুলো পাওয়ার অধিকার রাখে বলে এগুলোকে মানবাধিকার বলে।

একজন মানুষের প্রাপ্য অধিকার বলতে বেশ কিছু মৌলিক অধিকারকে বোঝায়। তবে সত্যিকার অর্থে পৃথিবীর অনেক দেশেই আজ মানবাধিকার মারাত্বকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। আমাদের চোখের সামনে এসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের অধিকার ঘটে। যুদ্ধ বিগ্রহে যেসব দেশ বিপর্যস্থ সেসব দেশে মানবাধিকারের কোন বালাই নেই। অভিবাসীরা বিভিন্ন দেশে অমানবিক জীবনযাপন করছে। পৃথিবীতে বহু মানুষের নেয়া জন্মই যেন আজন্ম পাপ। নূন্যতম অধিকারগুলোও তারা পায় না।

তাছাড়া জাতি থেকে জাতিতে, গোষ্ঠি থেকে গোষ্ঠিতে; দাঙ্গা-হাঙ্গামা লেগেই আছে, যখন কোনো দেশে এরকম অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করে তখন মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়। উদাহরণের জন্য খুব বেশি দুরে যাওয়ার দরকার নেই, খুব কাছের দেশ মিয়ানমার থেকে যে লাখ লাখ মানুষ আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছে নিজ দেশে তাদের অধিকার বলে কিছু ছিল না। সব হারিয়ে তারা আজ আশ্রিত।

কোথায় মানবাধিকার? মিয়ানমারের সেই মানুষগুলোরও এই পৃথিবীতে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। কিন্তু নিজ দেশে নির্বিঘ্নে জীবন যাপন করার বদলে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশের সীমানায় আশ্রয় নিয়েছে। শুধু বাংলাদেশই নয়, বিভিন্ন দেশের সীমান্তে অভিবাসীদের ভিড় বাড়ছে। সাগরে নৌকায় দিনের পর দিন না খেয়ে থেকে ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছে প্রাণের ভয়ে পালিয়ে আসা সেই মানুষগুলো। এভাবেই মানবতা আজ সারাবিশ্বে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে বেড়াচ্ছে।

এরকম বহু বছর ধরে অধিকার হারিয়ে নির্বাসিত কত লক্ষ লক্ষ মানুষ। কেবল দুবেলা দুমুঠো খাবার জুটলেই সব পাওয়া হয় না। নূন্যতম মৌলিক চাহিদাগুলো অন্তত পূরণ হওয়া দরকার। প্রতিটি মানুষেরই সুস্থ স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।

কিন্তু আমাদের কারণেই সেই অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। সবথেকে ভয়াবহ অবস্থা আজকের ইয়েমেনে। এই বিশ্ব এখন শিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নয়। আজও বিশ্বে ক্ষুধা তৃষ্ণায় শিশুরা মারা যায়। বহু শিশু দুর্ভিক্ষের কবলে রয়েছে ইয়েমেনে। আপনি কি জানেন? ইয়েমেনের এখন কি অবস্থা? ইয়েমেনে এক টুকরো পাউরুটি এবং এক মগ দুধ খাওয়াকে এখন বিলাসিতা বলা হয়।

ইয়েমেনের এই অবস্থাকে ‘ভয়াবহ’ বলা হচ্ছে। খাদ্যাভাব যে কতটা নিদারুণ সেটি সোনার বাংলার মানুষও খুব ভালোভাবে জানে। এই সোনার বাংলা একসময় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে ফিকে হয়ে গিয়েছিল। সেই দুর্ভিক্ষ আজও এক ভয়াবহ ইতিহাস হয়ে আছে। ভয়াবহ সেই দুর্ভিক্ষে খাদ্যাভাবে প্রায় এক কোটি মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। যে ঘটনাকে ‘ছিয়াত্তুরের মন্বন্তর’ বলা হয়।

এরপরেও বাংলায় দুর্ভিক্ষ হয়। যা পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত। সেসময় প্রায় ত্রিশ লাখ মানুষ মারা যায়। মানুষের অধিকার বিষয়টি এমন যে দেশে দেশে এর পার্থক্য চোখে পরে। যেসব শিশুর জন্মের পর রাস্তায় ঠাঁই হচ্ছে সে সব শিশুর মানবাধিকারের হিসেব কেই বা রাখে?

লাখ লাখ রোহিঙ্গা আজ আমাদের দেশে শরণার্থী হিসেবে ঠাঁই নিয়েছে। নিজের দেশে তারা নির্যাতনের শিকার হয়ে আজ বাংলাদেশে আশ্রিত। কোথায় আজ মানবাধিকার সেই প্রশ্ন মনে উঠতেই পারে। মানবাধিকার ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মাঝে, দেশ থেকে দেশে পার্থক্য ঘটে। জন্মের পর থেকেই যারা অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে তাদের সে অধিকার প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব মানুষের। কারণ মানুষের সৃষ্ট সমস্যার কারণেই মানবতা আজ বিপন্ন। যে সমস্যা মানুষেরই সৃষ্টি সেই সমস্যার সমাধান মানুষকেই করতে হবে।

যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশগুলো ছাড়াও পৃথিবীর অনেক দেশে মানবতা চরম সংকটে রয়েছে। কতজন মানুষ সমভাবে তিনবেলা পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে? কতজন মানুষ তার প্রাপ্য চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে বা স্বাচ্ছন্দে জীবন যাপন করতে পারছে। পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতিতে ষ্পষ্টভাবে দুটি শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছে। এক শ্রেণি ক্রমাগতভাবে সম্পদের মালিক হচ্ছে বিপরীতে অন্যপক্ষ গরীব হচ্ছে। দেশের মাথাপিছু আয় ঠিক থাকলেও বা বৃদ্ধি পেলেও তার সুফল সব মানুষ সমানভাবে পায় কি না তা খোঁজ নেয়ার কেউ থাকে না। এটাই বৈষম্য।

যখন বৈষম্য চরম আকার ধারণ কওে তখন ষ্পষ্টতই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। কারণ একপক্ষের জীবন কাটে আরাম আয়েশে অন্যপক্ষের জীবন কাটে নিদারুণ কষ্টে। পুজিবাদের সমস্যাই এটা। আপনি যখন রাস্তাঘাটে হেটে যাবে তখন শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে দেখা যায়। তারা লোহা-লক্কর ঝালাইয়ের মত কাজ বা হাতুড়ি পেটানোর মত কাজ অবলীলায় করছে। কিন্তু কেন এসব কাজ করছে তারা? উত্তর খুবই সহজ; পেটের দায়ে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ এর থেকে ভালো আর কি হতে পারে।

সত্যি কথা বলতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুপ শিকার হয় শিশু এবং নারীরা। স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারে একটি শিশু জন্ম নেয়ার সাথে সাথেই তার অধিকার নিশ্চিত থাকার কথা। কিন্তু পৃথিবীর নিয়মকানুন অদ্ভূত। কেউ জন্ম নেয় সোনার চামচ মুখে দিয়ে আবার কেউ কোন সুযোগ সুবিধা ছাড়াই জন্ম নেয়।

শিশু ও নারীদের ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। সমাজের নিষ্ঠুরতা, অধিকার বঞ্চিতের তালিকায় এরাই প্রথম সারিতে রয়েছে। নারীদের ক্ষেত্রে আজও যৌতুকের জন্য নির্যাতন, অসহায়ত্বের সুযোগে নির্যাতন, নারীকে প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে বিক্রি করে দেয়া এসব করার মাধ্যমে নারীদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে,বাধ্যতামূলক পতিতাবৃত্তি।

আমাদের দেশের প্রেক্ষপটে বাল্যবিয়ে এখন একটি সাধারণ ঘটনা। দেশের অগ্রযাত্রার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে এই বাল্যবিয়ে। বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার সংগঠন রয়েছে। এর বাইরে বহুভাবে, বহুরুপে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে যার কোনো প্রতিকার আমরা করতে পারছি না।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো কোথাও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে সোচ্চার হয়। এর প্রতিবাদ করে। তবে তাতে মানবাধিকার লংঘনের হার কমছে না। মানবাধিকার সঠিকভাবে প্রয়োগের জন্য যেমন আইনের সঠিক প্রয়োগ দরকার তেমনি অন্যের অধিকারকে সম্মান করা উচিত। মানবাধিকার রক্ষায় সকলের সর্বাত্বক প্রচেষ্টা থাকতে হবে।

#অলোক আচার্য, পাবনা প্রতিনিধি।

Agami Soft. - Inventory Management System

পাঠকের মতামত