গরুর ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’! প্রতিকার করবেন যেভাবে

বাংলাদেশে গুরত্বপুর্ণ একটি গবাদি পশু হল গরু। আমাদের দেশে গবাদী পশুর সবথেকে ভয়ানক রোগ ধরা হয় ‘ক্ষুরা রোগ’। এই ক্ষুরা রোগের আক্রমণে দেশে হাজার হাজার গরু মারা গিয়েছে, অনেক খামার ধ্বংস হয়ে গেছে। গরু নিয়ে যাদের ব্যবসা তারা এই ক্ষুরা রোগের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারাতে হয়েছিল।

তবে বর্তমানে গরুর সবথেকে মারাত্মক রোগ ধরা হয় ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’। এটি গরুর একটি চর্ম রোগ। আমাদের দেশে এ রোগ সর্বপ্রথম শনাক্ত করা হয়েছিল চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহায়। বর্তমানে একরকম মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে এই রোগ। এখন পর্যন্ত দেশের ৪০টি জেলায় এই চর্ম রোগে আক্রান্ত গরুর সন্ধান পাওয়া গেছে। এটি ছোঁয়াচে রোগ হওয়ার কারণে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে জানা যায়, শুধুমাত্র চট্টগ্রামেই ২০ শতাংশেরও বেশি খামার গরুর এই চর্ম রোগে আক্রান্ত। তবে খামার ছাড়াও পারিবারিকভাবে যেসকল গরু লালন-পালন করা হচ্ছে সেসকল গরুও এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে। যে হারে এই রোগের বিস্তার দেখা যাচ্ছে, দ্রুত কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ডেইরী ও চামড়া শিল্প ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে মনে করছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।

কোথা থেকে এ রোগের উৎপত্তি? সবথেকে বড় সমস্যা হল এই রোগটি বাংলাদেশে একেবারেই নতুন। এটি মূলত আফ্রিকা মহাদেশে বেশি দেখা যায়। যার ফলে বাংলাদেশে এখনো এর প্রতিষেধক আবিস্কার করা হয়নি। ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ বা গরুর চর্ম রোগ সর্বপ্রথম ১৯২৯ সালে আফ্রিকার জাম্বিয়ায় ধরা পড়ে। কিন্তু পরবর্তিতে এই রোগ খুব দ্রুত দক্ষিণ আফ্রিকা, বতসোয়ানা, মোজাম্বিকসহ আরো কয়েকটি আফ্রিকান দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগের কারণে আফ্রিকার অনেক বড় বড় গরুর খামার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

২০১৩ সালে মধ্যপ্রাচ্যে এবং ২০১৫ সালের দিকে আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, কাজাখস্তানে এ রোগ আবার সামনে চলে আসে। ২০১৬ সালে গ্রিস, সাইপ্রাস, বুলগেরিয়া, সার্বিয়া, কসোভোয় ছড়িয়ে পড়ে লাম্পি স্কিন ডিজিজ। চলতি বছর এশিয়া মহাদেশের চীন ও ভারতের কিছু অঞ্চলে এ রোগ দেখা দেয়। সর্বশেষ ভারতের উড়িষ্যা এবং অন্যান্য প্রদেশ থেকে বাংলাদেশে রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বাংলাদেশে এ রোগের বিস্তারের পিছনে চোরাইভাবে ভারতীয় গরু দেশে প্রবেশের কারণ হিসেবে দেখছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।

আরও পড়ুন>>> গরুর আফ্রিকান রোগ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের ৪০ জেলায়

এই রোগ কিভাবে ছড়ায়? লাম্পি স্কিন ডিজিজ অনেকটা ডেঙ্গুর মত ছড়ায়। মশা-মাছির মাধ্যমে এই রোগের জীবাণু একস্থান থেকে অন্যস্থানে বিস্তার করতে সক্ষম হয়। সাধারণত, বর্ষার শেষে অথবা শরতে শুরুতে এই রোগের পাদুর্ভাব দেখা দেয়। কারণ এই সময়টাতে মশা-মাছি সবথেকে বেশি বংশবিস্তার করে থাকে। এমনকি পশুর লালার মাধ্যমেও এই রোগের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া, নাক-চোখের ডিসচার্জ, ব্যবহৃত ইনজেকশনের সিরিঞ্জ ইত্যাদির মাধ্যমে ছড়ায়।আক্রান্ত পশুর দুধ পান করে বাছুরও এই রোগে আক্রান্ত হয় বলে গবেষণায় জানা গেছে।

এই রোগের ভাইরাসের স্থায়িত্ব ও লক্ষণ কেমন? এই রোগের ভাইরাস খুবই শক্তিশালী। এই ভাইরাস অনুকূল পরিবেশে ছয় মাস পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত গরুর জ্বর দেখা দেয়। অস্বাভাবিকভাবে শরীরে তাপমাত্রা (১০৪-১০৬) বেড়ে যায়। মুখ দিয়ে লালা ঝরে। খাবারে অরুচি দেখা দেওয়ার ফলে শরীর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ওজন কমে যায়।

এর সবথেকে বড় লক্ষণ হচ্ছে শরীরে চামড়ায় টিউমারের মত ফুলে যায়। ফুলে যাওয়া স্থানের পশম উঠে যায়। এরপর সেখানে ক্ষত সৃষ্টি হয়। ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরতে দেখা যায়। মুখের মধ্যেও এই ধরণের ক্ষত হয়ে থাকে। যার ফলে গরু খাবার খেতে পারে না। গরু পানি খেতে পারে না।

এই রোগের প্রতিকার কিভাবে সম্ভব? প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা জানান, এটি বাংলাদেশে একেবারেই নতুন, তাই এখনো এর কোনো প্রতিষেধক তৈরি হয়নি। তবে রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রথম অবস্থায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিলে ১০-১২ দিনের মধ্যে গরু সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু নিবিড় পরিচর্যা করতে হবে তার জন্য।

গরুর খামারের আশেপাশে আবর্জনা রাখা যাবে না। গরুকে পরিপুর্ণ পরিষ্কার রাখতে হবে। প্রয়োজনে বেশি বেশি গোসল করাতে হবে। খামারে কোনো গরু আক্রান্ত হলে সাথে সাথে তাকে আলাদা করে চিকিৎসা দিতে হবে।

চট্টগ্রামের গরুর খামারের মালিকদের সংগঠন চিটাগং ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম জেলাজুড়ে প্রায় দুই হাজারের বেশি গরুর খামার আছে। তাছাড়া ঘরে গৃহপালিতভাবে গরু লালন-পালন করা হয়। বর্তমানে চট্টগ্রামের প্রায় ১ হাজার ২০০ খামার কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত হয়েছে এ রোগে।


চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এবং পাশাপাশি সকল চাকরির প্রস্তুতি প্রকাশ করা হয়। এছাড়া দিনের ব্রেকিং নিউজ সবার আগে পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন:facebook-button-join-group

সরকারি এবং বেসরকারি চাকুরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পেতে

facebook-button-join-group

Agami Soft. - Inventory Management System

পাঠকের মতামত