সাউথইস্ট ব্যাংকের ১১৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও ব্যবসায়ী দম্পতি!

সাউথইস্ট ব্যাংকের প্রায় ১১৫ কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ না করে উধাও নওগাঁর ব্যবসায়ী দম্পতি। এ ঘটনায় গত ৯ অক্টোবর নওগাঁর সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন সাউথইস্ট ব্যাংক। ওই দম্পতি দেশের বাইরে অবস্থান করছে বলে জিডিতে উল্লেখ করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

ওই দম্পতি ঋণ নিয়ে সময়ক্ষেপন করতে থাকে। ব্যাংকও তাদের সময় দিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু তারা ঋণ পরিশোধ করেনি। এক পর্যায়ে ব্যাংকের সাথে তারা সব ধরণের যোগাযোগ বন্ধ করে আত্মগোপন হয়ে যান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নওগাঁ শহরের বাসিন্দা গোপাল আগরওয়ালা এলাকার পুরনো ব্যবসায়ী। অটো রাইসমিল ছাড়াও ফিড প্রসেসিংয়ের ব্যবসা আছে তার পরিবারের। জেএন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অধীনে অটো রাইসমিল রয়েছে, যার ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোপাল আগরওয়ালা। আর মেসার্স শুভ ফিড প্রসেসিংয়ের স্বত্বাধিকারী তার স্ত্রী দীপা আগরওয়ালা।

ব্যাংক সূত্র থেকে জানা গেছে, জেএন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও শুভ ফিড প্রসেসিংয়ের অনুকূলে বিভিন্ন সময় ঋণের আবেদন করা হলে সাউথইস্ট ব্যাংক তা মঞ্জুর ও ছাড় করে। চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গোপাল আগরওয়ালার জেএস ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে ব্যাংকটির ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮৪ কোটি ১৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। তার স্ত্রী দীপা আগরওয়ালার শুভ ফিড প্রসেসিংয়ের কাছে ঋণ স্থিতির পরিমাণ ৩০ কোটি ৮০ লাখ ১৪ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে ব্যাংকটির নওগাঁ শাখায় ১১৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে এ ব্যবসায়ী দম্পতির।

সাউথইস্ট ব্যাংক নওগাঁ শাখার কর্মকর্তারা জানান, গ্রাহক ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করলেও তাদের ব্যবসায়িক দিক বিবেচনা করে আইনি পদক্ষেপে যায়নি ব্যাংক। বরং ঋণ পরিশোধের জন্য তাদের সময় দেয়া হয়েছে। তার পরও ঋণ পরিশোধ না করে দেশ ছেড়েছেন এ ব্যবসায়ী দম্পতি। বিষয়টি উল্লেখ করে ব্যাংকের নওগাঁ শাখার প্রধান মো. কামারুজ্জামান বাদী হয়ে একটি জিডি করেছেন।

দুই সপ্তাহ ধরে আগরওয়ালা দম্পতির সন্ধান না পাওয়ায় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জিডি করা হয়েছে বলে জানান সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এম কামাল হোসেন। তিনি বলেন – গোপাল আগরওয়ালা নওগাঁর বড় ব্যবসায়ী। আট বছর আগে থেকে সাউথইস্ট ব্যাংকের সঙ্গে তার ব্যবসা চলছে। অন্য ব্যাংকেও তার ঋণ রয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করেই তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য ভবিষ্যতের কথা ভেবেই ব্যাংকের পক্ষ থেকে সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।

এম কামাল হোসেন বলেন – ঋণের বিপরীতে গোপাল আগরওয়ালার চালকল, ফিড মিলসহ বেশকিছু স্থায়ী সম্পদ সাউথইস্ট ব্যাংকের কাছে জামানত আছে। প্রাইম ব্যাংকের নওগাঁ শাখার অবস্থান তার মালিকানাধীন ভবনে। দ্রুতই এ ব্যবসায়ী ফিরে আসবেন বলে আমরা মনে করছি। তবে দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে, এমন ব্যবসায়ীদের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে আরো সতর্ক হওয়া উচিত।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গোপাল আগরওয়ালার জন্ম নওগাঁর লিটন ব্রিজ মোড়ে। সেখানে কাপড়ের ব্যবসা ছিল তার বাবা জগন্নাথ আগরওয়ালার। ১৯৯৪ সালে বগুড়া জেলার দুপচাঁচিয়া উপজেলায় হাসকিং চালকল স্থাপন করেন তিনি। ২০১৩ সালে একই স্থানে অটো রাইসমিল স্থাপন করেন গোপাল আগরওয়ালা, যার নাম দেন জেএন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। পাশাপাশি ভারত থেকে চাল আমদানিও করতে থাকেন। এছাড়া শুভ ফিড প্রসেসিং নামে প্রাণী খাদ্যের ব্যবসাও শুরু করেন গোপাল আগরওয়ালার স্ত্রী দীপা আগরওয়ালা।

সরেজমিন জেএন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে গিয়ে দেখা যায়, সাউথইস্ট ব্যাংক লিমিটেড নওগাঁ শাখার পক্ষ থেকে সম্পত্তির তফসিল উল্লেখ করে নোটিস ঝোলানো। তাতে জমির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ১৩ দশমিক ১৫ বিঘা। ব্যাংকের পক্ষ থেকে চারজনসহ মোট ১৪ জন নিরাপত্তারক্ষী রাখা হয়েছে সেখানে। তবে কারখানার সব কার্যক্রম বন্ধ। গুদামও ফাঁকা পড়ে আছে। দুই মাস ধরে বেতন হয় না প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের। এক সময় ৪৫ জন কর্মচারীর বেশির ভাগকেই ছাঁটাই করা হয়েছে। মিলের যন্ত্রপাতিতেও মরিচা ধরেছে।

জেএন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ভেতরে পূর্ব দিকে প্রায় এক বিঘা জায়গার ওপর মেসার্স শুভ ফিড প্রসেসিং কারখানা, যা আদতে একটি ‘গুদাম’। মেঝেতে কয়েকটি পলিথিন ছাড়া আর কিছু নেই। এর স্বত্বাধিকারী দীপা আগরওয়ালাকে ৩০ কোটি ৮০ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে সাউথইস্ট ব্যাংক।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই এলাকার প্রতি শতক জমির মূল্য বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ টাকা। সে হিসাবে ১৩ দশমিক ১৫ বিঘা জমির দাম দাঁড়ায় ১৩ কোটি টাকার কিছু বেশি। স্থাপনাসহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের মূল্য ৪০ কোটি টাকার বেশি হবে না। অর্থাৎ জমিসহ স্থাপনার মোট মূল্য সর্বোচ্চ ৫৩ কোটি টাকা। এর প্রায় দেড় গুণ ঋণ রেখে আত্মগোপনে গেছেন আগরওয়ালা দম্পতি, যা নিয়ে থানায় জিডি করেছে সাউথইস্ট ব্যাংক।

জিডির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নওগাঁ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহরাওয়ার্দী হোসেন। তিনি বলেন – ব্যাংকের তরফ থেকে একটি অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

Agami Soft. - Inventory Management System

পাঠকের মতামত