সৌদি যুবরাজের ভিশন ২০৩০! বাংলাদেশি শ্রমিকদের কপালে দুঃখ

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবথেকে বড় অংশটি হচ্ছে সৌদি আরব। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে পাড়ি দেওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ২ লাখ ২৭ হাজার ৩০৪ জন। এরমধ্যে শুধু সৌদি আরবেই পাড়ি জমিয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ৯৩৫ জন।

কিন্তু সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘোষিত ভিশন- ২০৩০ কর্মসূচী সৌদিতে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকের মহাকাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুবরাজের এই ভিশন- ২০৩০ কর্মসূচীর ফলে শ্রমবাজারে শতভাগ স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সৌদি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। একইসাথে এই কর্মসূচী জ্বালানি খাতের উপরও অর্থনীতি নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

তবে এই চোরাবালির মাঝে সবথেকে বেশি ফেঁসেছেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা। ভিশন- ২০৩০ কর্মসূচীর প্রতিক্রিয়ায় প্রতিদিন কাজ হারাচ্ছেন শতশত প্রবাসী। আকামা বা নিয়োগকর্তার অনুমতিপত্র হারিয়ে হয়ে যাচ্ছেন অবৈধ অভিবাসী। যার ফলে সৌদি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়ে শাস্তিভোগ করে ফিরতে হচ্ছে দেশে। শুধু গত ১৫ সেপ্টেম্বর ১৭৫ বাংলাদেশি নানা অভিযোগ নিয়ে সৌদি আরব থেকে গতকাল রবিবার রাত ১১.০৭ মিনিটে সৌদি এয়ারলাইন্স SV-804 বিমান যোগে ঢাকায় পৌঁছান ১৭৫ বাংলাদেশি।

অভিবাসী শ্রমিকনির্ভর অর্থনীতি বাদ দেওয়ার পরিকল্পনায় সৌদি আরবের বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান খাত অনেকট নিষ্কৃয় হয়ে পড়েছে। বিশেষত নির্মাণ খাতের সৌদি কোম্পানিগুলো পড়েছে আর্থিক বিপর্যয়ে। সৌদি বিন লাদেন গ্রুপ, সৌদি ওগেরসহ অনেক বড় নির্মাণ প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করছে।

আরও পড়ুন>>>মধ্যরাতে এক কাপড়ে সৌদি থেকে ১৭৫ বাংলাদেশিকে ফেরত

নির্মাণ ও সরবরাহ খাতের ছোটখাটো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোও একই কৌশল নিয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি। বৈধভাবে দেশটিতে গেলেও নিয়োগকর্তা আকামা নবায়ন না করায় তারা অবৈধ হয়ে পড়ছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক এড়াতে অনেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আকামা সমস্যা সমাধানে প্রতিদিনই সৌদির বাংলাদেশ দূতাবাসে শ্রমিকরা অভিযোগ করছেন। দূতাবাস থেকে এ বিষয়ে ঢাকায় লিখিত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। এসব সমস্যা দূতাবাসের পক্ষে একা সমাধান করা সম্ভব নয়। এজন্য সৌদি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে যারা আকামা জটিলতায় পড়েছেন, কোম্পানি থেকে তাদের আকামা করে দেয়ার নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ কোম্পানি সেটি করছে না। তবে বিষয়টি সমাধানে দূতাবাস কাজ করছে বলে দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সৌদি আরবে কাজের ক্ষেত্রে বিদেশিদের দেশটিতে বসবাসের অনুমতিপত্র বা ওয়ার্ক পারমিট থাকতে হয়। আরবিতে এ অনুমতিপত্রের নাম ‘আকামা’। সৌদি কোম্পানিগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশি শ্রমিকের নামে আকামা ইস্যু করার পরই সেটি দেখিয়ে দূতাবাস থেকে ভিসা নিতে হয়। প্রবাসে থাকাকালেও কর্মীদের আকামা নিয়ে চলতে হয়।

কোনো কারণে আকামা হারিয়ে গেলে ওই সৌদিতে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। যেকোনো সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নাজেহাল হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই আকামা হারালে সঙ্গে সঙ্গে নিয়োগকর্তাকে জানাতে হয়। পরবর্তীতে নিয়োগদাতা নতুন আকামার ব্যবস্থা করে দেন। এ ছাড়া পেশা পরিবর্তন করতে চাইলেও নতুন করে আকামা বা অনুমতিপত্রের প্রয়োজন পড়ে।

আরও পড়ুন>>> সৌদি আরবে “সৌদিকরণ” এর ফাঁদে পড়ে নাভিশ্বাস প্রবাসী বাংলাদেশীদের

সৌদি আরবে জনবল সরবরাহকারী রিক্রুটিং এজেন্সির এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে সৌদির পরিস্থিতি ভালো নয়। বেশকিছু নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে আছে। যেগুলো সচল, সেগুলোর কাজও ধীরগতিতে চলছে। এতে হাজার হাজার শ্রমিক বিপদের মধ্যে আছেন। আকামা নেই, কাজ নেই, বেতন নেই-এমন ৫০-১০০ জন শ্রমিক প্রতিদিনই বাংলাদেশ দূতাবাসে ভিড় জমাচ্ছেন। এরপরও দেশে বেশকিছু রিক্রুটিং এজেন্সি মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ৫-৬ লাখ টাকা নিয়ে সৌদি আরবে শ্রমিক পাঠানো অব্যাহত রেখেছে বলে তিনি জানান।

জানা গেছে, বর্তমানে সৌদি আরবে জীবনযাত্রার মানে পরিবর্তন ঘটছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় বিদেশি শ্রমিকরা এখন স্বেচ্ছায় দেশটি ছেড়ে যাচ্ছেন। আকামা ইস্যুর ফি কোম্পানির বহন করার কথা। একজন কর্মীর আকামা ফি বাবদ ৮-৯ হাজার সৌদি রিয়াল ব্যয় হয়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় পৌনে ২ লাখ টাকা।

তবে কোম্পানিতে কাজ না থাকলে মালিকরা আকামার খরচ দিতে চান না, যার পরিপ্রেক্ষিতে বৈধ শ্রমিকরাও অবৈধ হয়ে পড়েন। এর মধ্যে পুলিশি অভিযানে ধরা পড়লে তাদের ডেপুটেশন সেন্টারে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। পরবর্তীতে অনেককে ১৫ দিনের মধ্যে সৌদি সরকারের জাকাত ফান্ডের অর্থে টিকিট কেটে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়েছেন বাংলাদেশি শ্রমিক। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই গেছেন

Agami Soft. - Inventory Management System

পাঠকের মতামত