২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা: মামলা নিয়ে এসব কি হচ্ছে!

২১ আগস্ট। অন্যসব দিনের মত এই দিনেও সূর্য্য উঠে। মানুষ কর্মজীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে এইদিনেরও একটি ইতিহাস আছে। কালো ইতিহাস। ২০০৪ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রনেড হামলার মত ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে। আজ তার ১৫ বছর পূর্ণ হল।

ওই দিন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা জনসভায় বক্তৃতা প্রদানকালে সন্ত্রাসীরা গ্রেনেড হামলা চালায়। এতে নিহত হয়েছেন ২২ জন। আহতের পরিমাণ সংখ্যায় বলার মত না। এখনো সেই ভয়াবহ হামলার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন কয়েকশ নেতাকর্মী। শরীরে স্প্লিন্টারের ঝনঝনানি নিয়ে এক করুণ জীবনযাপন করছেন। ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠেন এখনো।

ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারেনা। শরীরের ক্ষত আর স্প্লিন্টারের শব্দ সেই কালো দিনটির কথা মনে করিয়ে দেয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও হামলায় আহত হয়েছিলেন। তাঁর ডান কানের শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের উপর করা হামলার মামলার শুনানি এখনো শেষ হয়নি। প্রায় দেড়যুগ পার হয়ে গেলেও তারা এখনো বিচার পায়নি। মামলার পেপারবুক তৈরির কাজ এখনো শেষ হয়নি। কবে নাগাদ পেপারবুক তৈরির কাজ শেষ হবে তার দিনক্ষণও জানাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

তবে সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার মোহাম্মদ সাইফুর রহমান এই মামলার ব্যপারে গণমাধ্যমকে বলেন – সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলার পেপারবুক তৈরির কাজ চলমান। যত দ্রুত সম্ভব পেপারবুক তৈরির কাজ সম্পন্ন হবে। অপরদিকে, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন – পেপারবুক তৈরির কাজ শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষ থেকে যত দ্রুত সম্ভব মামলার শুনানির ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কত দিনের মধ্যে এই মামলার শুনানি শুরু হতে পারে-এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল নিজ কার্যালয়ে মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন – এটা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব না কবে শুনানি শুরু হবে। তবে পেপারবুক হলে আমি পদক্ষেপ নেব।

ভয়াবহ এই গ্রেনেড হামলার ১৪ বছরের মাথায় পৃথক দুটি মামলায় গত বছরের ১০ অক্টোবর বিএনপি নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয় আরও ১১ জনের। সাজাপ্রাপ্ত ৫১ আসামির মধ্যে এখনো পলাতক আছেন ১৮ জন।

গত ১৩ জানুয়ারি দুই মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও জেল আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দিয়েছিলেন।

আইন অনুযায়ী, বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে। এ জন্য রায় ঘোষণার পর বিচারিক আদালত মামলার নথিপত্র হাইকোর্টে পাঠিয়ে দেন। যা ডেথ রেফারেন্স নামে পরিচিত। নথিপত্র পাওয়ার পর হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সংশ্লিষ্ট মামলার পেপারবুক প্রস্তুত করে।

পেপারবুক প্রস্তুত হলে মামলাটি শুনানির জন্য প্রস্তুত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়।নিজ কার্যালয়ে মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। ছবি: আসাদুজ্জামাননিজ কার্যালয়ে মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। ছবি: আসাদুজ্জামান

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা হয়। এতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী সে সময়ের মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভি রহমানসহ ২২ জন মারা যান। আহত হন কয়েক শ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও সেই সময়ের বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। তবে তাঁর কান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আপিল করেনি রাষ্ট্রপক্ষ : বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ হাইকোর্টে আবেদন করলেও রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সাজা বাড়ানোর কোনো আবেদন করা হয়নি। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন – যাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে, যারা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের সাজা বৃদ্ধির ব্যাপারে আপিল করার কোনো নির্দেশনা ছিল না। অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস কোনো আপিলও করেনি।

তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে নানা চেষ্টা : বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা হয়। শুরু থেকেই নৃশংস ওই হত্যাযজ্ঞের তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে নানা চেষ্টা করা হয়। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে নতুন করে তদন্ত শুরু করে। বেরিয়ে আসে অনেক অজানা তথ্য।

২০০৮ সালের জুনে বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তাঁর ভাই তাজউদ্দীন, জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি-বি) নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। তদন্তে বেরিয়ে আসে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ওই হামলা চালানো হয়েছিল। হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড এসেছিল পাকিস্তান থেকে।

বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই এ-সংক্রান্ত মামলার বিচার শুরু হয়। ৬১ জনের সাক্ষ্য নেওয়ার পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার এসে এর অধিকতর তদন্ত করে। এরপর বিএনপির নেতা তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদসহ ৩০ জনকে নতুন করে আসামি করে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি।

এরপর দুই অভিযোগপত্রের মোট ৫২ আসামির মধ্যে তারেক রহমানসহ ১৮ জনকে পলাতক দেখিয়ে বিচার শুরু হয়। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

বিচারিক আদালতের পর্যবেক্ষণ : বিচারিক আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন – রাজনীতি মানে কি বিরোধী দলের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ? এই রাজনীতি এ দেশের জনগণ চায় না । সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে, তাই বলে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা চালানো হবে? রাজনীতিতে এমন ধারা চালু থাকলে মানুষ রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়বে।

আদালত এ দেশে আর এমন হামলার পুনরাবৃত্তি চান না—মন্তব্য করে বিচারক শাহেদ নূর উদ্দীন বলেন – প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ওপর হামলা বা রমনা বটমূলে হামলার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি চায় না। আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে নৃশংস হামলার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব।

Agami Soft. - Inventory Management System

পাঠকের মতামত