বোনের কাছে মোবাইল ফোনে আরেক বোনের বাঁচার আকুতি

“বোন ও  আমাকে মেরে ফেলবে, প্রতিদিন আমাকে মারে। আমাকে বাঁচা বোন। মাকে বল কালই এসে আমাকে যেন এই নরক থেকে নিয়ে যায়”।  মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও নেশাগ্রস্থ স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির নির্যাতন থেকে বাঁচতে ছোট বোনের কাছে আর্তনাদ করেছিল সুমাইয়া আক্তার বর্ষা। বাঁচার আশায় বোন মীমকে ভিডিও কল করে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল এ কথাগুলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের বন্দরে শ্বশুরবাড়ি থেকে লাশ উদ্ধার করা হয় বর্ষার।

বর্ষার বয়স মাত্র একুশ পেরিয়েছে। চার বছরের একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তান ছিল। নিষ্ঠুর স্বামী নিজেই বাঁচতে দিলো না তাকে। বাবার কাছ থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা যৌতুক এনে না দেওয়ায় স্বামীর হাতেই প্রাণ দিতে হলো মেয়েটিকে। ঘটনাটি  সোমবার রাত আনুমানিক ৯টায় বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের আলী সাহারদী এলাকার।
শ্বশুর বাড়িতে শারীরিক নির্যাতনের পর শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে মেয়েটির স্বামীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় পুলিশ অভিযুক্ত স্বামী মোস্তাফিজুর রহমান নয়নকে গ্রেফতার করেছে।

নিহত বর্ষার স্বজনরা জানান, ২০১৩ সালে আলী সাহারদী এলাকার শহিদুল্লাহ মিয়ার ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান নয়নের সাথে রাজধানীর কদমতলী থানার দনিয়া শরাইল এলাকার বাসিন্দা মনজুর ভূঁইয়ার বড় মেয়ে বর্ষার পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের সময় নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও আসবাবপত্র বাবদ দশ লক্ষ টাকা খরচ করে বর্ষার পরিবার। বর্ষার সংসারে সাড়ে চার বছরের একটি কন্যা সন্তানও রয়েছে।

নিহতের পরিবারের নিকট আত্মীয় স্বজনদের ভাষ্য, গত দুই বছর আগে চাকরি হারানোর পর ইয়াবার নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে বর্ষার স্বামী নয়ন। হাতে নেশার টাকা না থাকলে অত্যাচার চলতো বর্ষার উপর। হাতের সামনে যা পেতো তাই দিয়ে পিটিয়ে শরীর ফুলিয়ে ফেলতো। নেশার ঘোরে কোন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলতো নয়ন। সেই সাথে তাল মিলাতো নয়নের মা, বাবা ও ছোট ভাইটা পর্যন্ত। শ্বশুর বাড়ির একটি মানুষ কখনো কথা বলেনি তার পক্ষ হয়ে। নয়নের নির্মম অত্যাচারের প্রতিবাদও করেনি কেউ। এতো অত্যাচার সহ্য করেও সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে স্বামীর ঘর করে যাচ্ছিল বর্ষা।

বর্ষার বাবা মনজুর ভূঁইয়ার অভিযোগ, গত প্রায় এক বছর আগে নিজের জমি বিক্রি করে বেশ কিছু টাকা হাতে পান তিনি। তবে টাকা হাতে পেয়ে সেই টাকা নিজের ব্যবসায় বিনিয়োগ করে ফেলেন তিনি। তবে জমি বিক্রি করে তিনি টাকা পেয়েছেন সেই খবর জানতে পেরে মেয়ের জামাতা নয়ন ব্যবসা করার অজুহাতে বর্ষার মাধ্যমে তার কাছে পাঁচ লক্ষ টাকা যৌতুক দাবি করে। এ নিয়ে নয়ন ও বর্ষার মধ্যে পারিবারিক কলহ চলতে থাকে। বর্ষা তার মা বাবা ও বোনকে ফোন করে সেসব জানালে অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে যেতো।

মনজুর ভুঁইয়ার আরও অভিযোগ, দাবিকৃত সেই টাকা এখন পর্যন্ত না দেওয়ার নয়ন তার মেয়ে বর্ষার উপর বেশ কিছুদিন যাবত মারধরসহ নানাভাবে শারীরিক নির্যাতন করে আসছে। ঈদের কয়েকদিন আগে থেকে এ পর্যন্ত  প্রতিদিনই বর্ষাকে মারধর করতো নয়ন। দাবিকৃত টাকার অজুহাতে সোমবার রাতে নয়ন তার স্ত্রী বর্ষাকে আবারো মারধর করে এবং শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।

এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে শত শত মানুষ নয়নদের বাড়িতে এসে ভিড় করতে থাকেন। খবর পেয়ে বন্দর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বর্ষার লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য সদরের জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পরে পরিবারের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত নয়নকে পুলিশ গ্রেফতার করে।

বর্ষার ছোট বোন মীম জানায়, সোমবার বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে বর্ষা তাকে ইমোতে ভিডিও কল দিয়ে খুব কান্নাকাটি করে। স্বামী নয়ন প্রতিদিন মারধর করে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করেছে বলে জানায়। এই বাড়িতে থাকলে স্বামী নয়ন মারধর করে মেরে ফেলবে এই ভয়ে বর্ষাকে বাবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য বোনকে অনুরোধ করে। প্রায় এক ঘণ্টা দু’বোনের মধ্যে এ নিয়ে কথা হয়।

এর কয়েক ঘণ্টা পরেই রাত আনুমানিক নয়টার দিকে বাসায় খবর আসে বর্ষা আর বেঁচে নেই। বোনের সাথে শেষ কথোপকথনের বর্ণনা দিতে গিয়ে দম আটকে যাবার অবস্থা হয় মীমের। তার একটাই দাবি, বোনের হত্যার সুষ্ঠু বিচার হতে হবে। বর্ষার মায়ের আকুতি, মেয়ের খুনের বদলে খুনি নয়নকে ফাঁসি দিতে হবে।

বন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, নিহত বর্ষার মরদেহের সুরতহাল পর্যবেক্ষণে গলায়সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে বর্ষার বাবা মনজুর ভূঁইয়া বাদি হয়ে বর্ষার স্বামী নয়নকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেছেন। সেই মামলা গ্রহণ করে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, আসামি নয়নকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। লাশের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

Agami Soft. - Inventory Management System

পাঠকের মতামত