ডেঙ্গু পরীক্ষায় অসামঞ্জস্যকর তথ্য

ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তারের মধ্যে রোগ পরীক্ষার ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানে একটি একটি অসামঞ্জস্যকর তথ্য মিলছে। বেশ কয়েকটি চিকিৎসালয়ে রোগ পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালে যত মানুষের ডেঙ্গু ধরা পড়ছে, বেসরকারি হাসপাতালে ধরা পড়ছে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।

দুই ধরনের হাসপাতালে রোগ পরীক্ষার হারে এই পার্থক্য কেন, সে বিষয়ে চিকিৎসকরা কিছু বলতে চাইছেন না। তবে এটি যে স্বাভাবিক নয়, সেটি বলেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক। তিনি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বলেছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল আজাদ বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বুধবার তারা ৪৬৫ জনের রক্ত পরীক্ষা করেছেন, কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র ১৬ জনের ডেঙ্গু ধরা পড়েছে।

শনিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন জানিয়েছেন, সরকারি হাসপাতালে যারা রক্ত পরীক্ষা করিয়েছেন, তাদের মধ্যে পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশের ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। তিনি বলেন, ‘হাজার হাজার রোগী হাসপাতালে আসছেন। তারা পরীক্ষা করার জন্য চিকিৎসকদের চাপ দিচ্ছেন; যাদের অধিকাংশের পরীক্ষা না করলেও চলে। পরীক্ষা যারা করছেন, তাদের শতকরা ৫-১০ শতাংশ ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে।’

কিন্তু ঢাকার আরও কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতালের এই পরিসংখ্যানের মিল নেই। ঢাকার চারটি বেসরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করে পরীক্ষা করাতে আসাদের মধ্যে শতকরা ২৫ থেকে ৩৫ ভাগের ডেঙ্গু ধরা পড়ার তথ্য মিলেছে।

এই অসামঞ্জস্যতা নিয়ে কোনো হাসপাতালগুলোর কর্তাব্যক্তিদের কেউ কথা বলতে রাজি ছিলেন না। একাধিক ব্যক্তি প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন এই কথা বলে যে, ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে আসাদের নথি রাখা হয় না। তবে কী পরিমাণ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন বা এখনও ভর্তি রয়েছেন সেটা তাদের নথিতে রয়েছে।

পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালের কর্মীরা জানায়, তাদের এখানে দিনে একশ থেকে দেড়শ রোগী ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে আসছেন গত কয়েক দিন ধরে। এদের মধ্যে শতকরা তিন ভাগের মতো ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। এই হাসপাতালটি থেকে এখন পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছেন ৪১২ জন।

গ্রিন রোডের গ্রিন লাইফ হাসপাতালেও প্রায় একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। তাদের ওখানেও ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে আসাদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশের মতো ডেঙ্গু ধরা পড়ছে বলে জানিয়েছেন একজন কর্মী। তবে মোট কত জন পরীক্ষা করিয়েছেন এবং তাদের মধ্যে কত জনের ডেঙ্গু ধরা পড়েছে, এই বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি ওই কর্মী।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমাদের এখানে যারাই পরীক্ষা করাতে আসছে করে দিচ্ছি। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত গড় হিসেবে ডেঙ্গু শনাক্তের হার ৫ থেকে ১০ শতাংশ হবে। বিশেষ করে প্রথম দিন ৯৩৫ জন ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে এসে ধরা পড়ে মাত্র ৩৫ জন। বেসরকারিতে কেন বেশি সেটা কনফার্ম না হয়ে কিছু বলা ঠিক হবে। তবে আমার মনে হয়, উচ্চবিত্ত আর নিশ্চিত হয়ে বেসরকারিতে যাওয়াতে সেখানে সংখ্যাটা বেশি।’

এই সন্দেহজনক পরিসংখ্যানের মধ্যে রাজধানীতে একটি বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা না করেই রক্ত পরীক্ষার প্রতিবেদন দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। উত্তরায় ক্রিসেন্ট নামে ওই হাসপাতালকে ১৭ লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়েছে।

বিশেষ করে জুলাই মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেশবাসীকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। গত এক সপ্তাহ ধরে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। আর প্রতিদিনই এক দিনে আক্রান্তের সংখ্যা আগের দিনকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

আবার চলতি বছর ডেঙ্গুর চরিত্র অন্য বছরের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এ বি এম আবদুল্লাহ জানাচ্ছেন, অন্য বছর ১০৩ থেকে ১০৪ ডিগ্রি জ্বর, সেই সঙ্গে অন্যান্য উপসর্গ ছিল। কিন্তু চলতি বছর এত জ্বর হচ্ছে না, আবার গায়ে ব্যাথাও থাকছে না। কিন্তু দেরি করলে রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, এবার যত রোগী মারা গেছেন, তাদের মধ্যে একটি বড় অংশই চিকিৎসায় দেরি করেছেন। এর সুযোগ নেই।

আর প্রায় ২৫ হাজার আক্রান্ত এবং ৬০ জনের মতো মৃত্যু আর ‘ভিন্ন ধাঁচের’ ডেঙ্গুর প্রকোপ আর চিকিৎসায় বিলম্বের বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন আসার পর সাধারণ জ্বর হলেই রোগীরা ভিড় করছেন হাসপাতালে। রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে চাইছেন তারা কেউ ডেঙ্গু আক্রান্ত কি না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাকিবুল হাসান রবিনের গায়ে জ্বর। বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছাত্র আক্রান্ত, প্রাণ হারিয়েছেন একজন। অন্যান্য বছর এমন অসুখে হলে দুই এক দিন শুয়ে বিশ্রাম নিতেন। কিন্তু এবার আর সময় নষ্ট করেননি। বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে চলে যান, রক্তের পরীক্ষা করেন। তবে ফলাফলে দেখা যায়, তার সাধারণ জ্বর। চিকিৎসক বলেছেন কয়েকদিন বিশ্রাম নিতে। তবে পরীক্ষার ফল আসার আগ পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছিলেন না রবিন।

সরকারি ও বেসরাকরি মিলিয়ে শনিবার সকাল আটটা থেকে গতকাল সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৮৭০ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে জানানো হয়েছে। এই রোগীদের মধ্যে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে এক হাজার ৫৩ জন এবং দেশের আট বিভাগে ৮১৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

গতকাল সকাল আটটা পর্যন্ত সারাদেশে ২৪ হাজার ৮০৪ জন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ডেঙ্গু নিয়ে। এদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে ১৭ হাজার ৩৮৮ জন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বাকিরা এখনো হাসপাতালে।

পুরো জুলাই মাসে সারাদেশে বিভিন্ন হাসপাতালে ১৫ হাজার ৬৫০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিলেন। আর, চলতি অগাস্ট মাসের প্রথম ৭২ ঘণ্টাতেই ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬ হাজার ৯৬৭ জন।

সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১৮। তবে বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্যে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই সংখ্যাটিকে বলা হচ্ছে ৬০ এর কাছাকাছি।

Agami Soft. - Inventory Management System

পাঠকের মতামত