পদ্মা সেতু নিয়ে এবার ছড়ানো হচ্ছে নতুন গুজব

গত ২০ জুলাই রাজধানীর বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে তসলিমা বেগম রেনু (৪২) নামক এক নারীকে হত্যা করা হয়। এর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এছাড়া”কল্লাকাটা” গুজবে কান না দিতে পুলিশ ও অন্যান্য প্রশাসন নানা রকম প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এসব গুজব রটানোর পেছনে যাদের হাত তাদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ।

কিন্তু এরইমধ্যে জন্ম নিয়েছে নতুন গুজব। আর গুজবের ভয়ে নিজের সন্তানদের স্কুলে যেতে দিচ্ছে না বাবা-মা। এমনকি বাচ্চারাও ভয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছে না। জানা যায়, গুজবটি এমন, “দুই দিন রাতে বিদ্যুৎ থাকবে না তখন সেদিন বাচ্চাদের ধরে নিয়ে যাবে”। যদিও পুলিশ এমন কোন গুজবের কথা এখনো শুনেনি।

রাজধানীর বাড্ডার নামাপাড়া এলাকার গৃহপরিচিকা এমনই একটি গুজবের কথা শুনে তার দুই ছেলেকে ঘর থেকেও বের হতে দিচ্ছে না। তাদের রিকশা শ্রমিক বাবাকেও ঘরের বাইরে যেতে দিচ্ছে না। রাশিদা কাজ করেন উত্তর বাড্ডায় ইভা দাসের বাসায়। আর গৃহকর্তার কাছে তিনি তার উদ্বেগের কথা খুলে বলেন। জিজ্ঞেস করেন – আফা, দুই দিন রাইতে নাকি কারেন (বিদ্যুৎ) থাকত না। সেই দিন বাচ্চাগো নাকি ধইরা নিয়া যাইব?

এ নিয়ে ইভা বলেন – আমি বললাম, এগুলো সব বাজে কথা। কিন্তু সে বুঝেছে বলে মনে হলো না। আমার কথায় আস্থা রাখতে পারছে না। আবার কোত্থেকে এসব কথা জেনেছে, সেটাও সুনির্দিষ্ট বলতে পারে না। বলে, বস্তির সবাই জানে।

গত কিছুদিন ধরেই এমন গুজব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই গুজব মানুষের মধ্যে এতোটাই প্রভাব ফেলেছে যে, মানুষ কোন মানুষের মধ্যে সন্দেহজনক কিছু দেখলেই গণপিটুনি দিচ্ছে। আর এতে করে দেশের কয়েকটি অঞ্চলে গণপিটুনিতে হত্যাকান্ডের মত ঘটনাও ঘটেছে। গুজব এতটাই বিস্তার লাভ করেছে যে, সেতু কর্তৃপক্ষকে বিবৃতি দিয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করতে হয়।

এদিকে র‍্যাব ও পুলিশ বিভিন্ন অভিযান চালিয়ে গুজব ছড়ানোর অপরাধে এখন পর্যন্ত ২৩ জনকে আটক করেছে বলে জানা গেছে। আর এই গুজবের সুযোগ নিয়ে কিছু মানুষ নানা রকম অপকর্ম করা চেষ্টা চালাচ্ছে। গুজবের বলী হয়ে গণপিটুনিতে এখন পর্যন্ত ১০ জনের মৃত্যুর খবর প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে গণপমাধ্যম। এছাড়া গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হয়েছে অনেকেই।

তবে এসব গণপিটুনির শিকার সবথেকে বেশী হচ্ছে মানসিক প্রতিবন্ধি এবং বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধিরা। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে। বাক প্রতিবন্ধী এক বাবা নিজের মেয়েকে দেখতে গিয়ে কথার জবাব না দেওয়ার কারণে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। এছাড়া লালমনিরহাটে মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধাকে পেটানো হয়েছে তার পিঠে ব্যাগ দেখে।

তবে পুলিশ সদরদপ্তর এসব গুজব এবং গণপিটুনি ঠেকাতে পুলিশকে কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে এসকল গুজব প্রচারের মূল ফ্ল্যাটফর্ম হচ্ছে ফেসবুক। সবই যে উদ্দেশ্যহীন তা নয়, ইংরেজি লিখতে পারেন, এমন ব্যক্তিরাও ইনবক্সে পাঠাচ্ছেন এসব বার্তা। একজন ম্যাসেজ পাঠানোর পর ‘এসব কী পাঠান?’-পাল্টা ম্যাসেজের জবাবে তিনি বলেন – ওকে দ্যান ইগনোর ইট (ঠিক আছে, তাহলে পাত্তা দিয়েন না)’।

এদিকে নতুন গুজব নিয়ে পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম ডিভিশন ইউনিটের উপকমিশনার আলীমুজ্জামান বলেন – আজ সকালেও অফিসারদেরকে ডেকে বলেছি। কিন্তু এমন গুজব ছড়ানোর বিষয়টি এখনো আমাদের নজরে আসেনি। তবে আগে গুজব ছড়ানোর কিছু সাইট ও আইডি ব্লক করেছি। তার সবগুলোই ঢাকার বাইরে। আমরা এখন মূল হোতাদেরকে শনাক্ত করে ধরার চেষ্টা করছি। আর নতুন কিছু পেলেও আমরা ব্যবস্থা নেব।

অপরদিকে, গুজব ছড়ানোর দায়ে সারা দেশ থেকে ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গুজব ছড়ানোর সঙ্গে জড়িতদের ধরতে এখনও অভিযান অব্যাহত আছে বলে জানান পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদীপ্ত সরকার।

এই গুজবের কারণে নিম্ম আয়ের মানুষরা বসবাস করেন, বিশেষত এমন এলাকায় স্কুলে উপস্থিতি কমে যাওয়ার খবর মিলেছে। এই স্কুলগুলো প্রধানত নগরীর উপকণ্ঠে অবস্থিত। রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার বাসিন্দা এক নারী তার দুই সন্তানকে স্কুলে দিচ্ছেন না গুজব আতঙ্কে। কেন এই সিদ্ধান্ত? ওই নারী বলেন – আমার ছেলে, মেয়ে গেলে তো আর ফেরত আসবে না।

মতিঝিল মডেল স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক মোহাম্মদ শফি বলেন – অনেক অভিভাবক আমাদের কাছে জানতে চান কতজন বাচ্চা এ পর্যন্ত নিখোঁজ হয়েছে? এটা আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক। এর মানে অভিভাবকরা অনেক বেশি আতঙ্কগ্রস্ত।

তবে এসব গুজব বন্ধ করতে হলে প্রথমে সমাজের বড়স্তরের মানুষের সাহায্য সবথেকে বেশী কার্যকর হবে। কারণ সাধারণ তাদের কথা মানবে বলে মনে হয়। অপরদিকে, ডিজিটাল মাধমে যারা গুজব ছড়াচ্ছে তাদের অবশ্যই গ্রেফতার করতে হবে।

Agami Soft. - Inventory Management System

পাঠকের মতামত