গোলাপগঞ্জে আন্তঃদলীয় জোট বাড়লেও উন্নতির কোন চিহ্ন নেই

সিলেটের গোলাপগঞ্জ একটি বৃহৎ আয়তন বিশিষ্ট উপজেলা। এখানে অনেক লোকের বসবাস গ্রামীন জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক ও প্রতিষ্ঠানিক উন্নয়নের স্বার্থ বিবেচনা ইতোপূর্বে বিভিন্ন সংগঠন তৈরি হয়েছে। যার উদ্দেশ্য ছিলো গ্রামীন জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সামাজিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অবস্থার উন্নতি সাধন করা,এ সকল সংগঠন গুলোই ভিন্ন ভিন্ন কার্য সাধনেই তৈরি হয়েছিল।

যার বেশির ভাগই সুদূর ইংল্যান্ড থেকেও পরিচালিত হয়ে আসছিল।কোনো সংগঠন শিক্ষা দিকটি দেখলে, অন্য সংগঠন সামাজিক বা আর্থিক দিকটি দেখতো।পূর্বের সংগঠনগুলো কোনো ধরনের প্রতিযোগীতায় লিপ্ত ছিল না, বরং সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতো।

কিন্তু বর্তমানে গ্রাম্য উন্নয়নের এসকল সংগঠনের চেহারার কোনো চিত্রেরই মিল পাওয়া যায় না। তাদের কার্যক্রমের দশা দেখলে মনে হয় গ্রাম্য উন্নয়ন নয় নিজেদের প্রচার প্রচারণা আর খ্যাতির জন্যই তাদের সংগঠনে যুক্ত হওয়া।বর্তমানে হরেক রকমের সংগঠন রয়েছে।তাদের প্রচারণার জন্য বিভিন্ন প্রচারনার মাধ্যম রয়েছে,গ্রামে উন্নতির বদলে যার ফলশ্রুতি গ্রাম্য অশান্তি।

এসব ঘটনা এখনকার সময়ে হরমেশাই ঘটছে। দূর-দূরান্তে অবস্থান করে আঞ্চলিক একটি নাম সংগঠনের নামের আগে জুড়িয়ে কেল্লা-ফতেহ। ব্যস, অল্প সময়ে আঞ্চলিকতার টানে একটা এলাকার সবাই যুক্ত হয়। প্রথমদিকে সবাইকে কাকুতি-মিনতি করে সবাইকে যুক্ত হওয়ার আবেদন করে। একটা সময় এ সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হলে সেই সদস্যদের ভাব-সাব পরিবর্তন হয়ে যায়। এমন করেই চলছে আমাদের আজকের দিনের ডিজিটাল সামাজিক সংগঠন।

অবশ্য, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এরা মাঝে মধ্যে ফেইসবুক নির্ভর ‘শীত-বস্ত্র বিতরণ’ ‘শিক্ষা-সামগ্রী বিতরণ’ ‘ঝাড়– দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার’ ‘বন্যা কবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ান নির্ভর ব্যানার – ফেস্টুন টাঙানো’ ‘যানজট নিরসনে সবার সহযোগীতা চাই’ এমন সব দৃষ্টিগোচর কর্মকাণ্ডে একদিন করে সময় ব্যয় করে।

ওই দিন কর্মসূচি শেষে প্রশাসনের দুই-একজন কর্মকর্তাকে ফুলের তোড়া দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়। যেন কাজটি সেই প্রশাসনিক কর্মকর্তা করেছেন। আর ছবি তো উঠাতেই হবে। এমন তেলবাজি আগে শুধু জানতাম রাজনীতির মধ্যে আছে কিন্তু সামাজিক সংগঠনের মাঝে এই তেলবাজিটা আমাকে আহত করেছে।

উপরের কার্যকলাপের চিত্র বাস্তবতায় ভিন্ন। আগেকার সময়ে সামাজিক সংগঠন করতে আমাদের বাবা-চাচা, মামাদের কি অক্লান্ত পরীশ্রমই না করতে হতো। তাঁদের কাছ থেকে শোনেছি, দিন রাত পরীশ্রম করে, নিজেদের পকেটের খুচরা টাকা একত্রিত করে সমাজের বিভিন্ন কাজে ব্যয় করতেন। এলাকার সম্মানিত মানুষ জানতেন ওমুক-তমুক সমাজের জন্য কাজ করছে। তাঁদেরকে সবাই চিনতো-জানতো, ভালোবাসতো।

আর আজকের সময় ফেইসবুকে নিজেদের ইচ্ছেমতো প্রকাশ করতে পারলেও বাস্তবে এদের অনেককেই সমাজের মুরুব্বিরা চিনে না, জানেও না। এরা হঠাৎ বৃষ্টির মতো আসে, আবার চলেও যায়। আগেকার সংগঠনের সমাজকর্মী আর এখনকার সমাজকর্মীদের মধ্যে পার্থক্য হলো, আগে যুবকরা কাজ করতেন সমাজের পরিবর্তনের জন্য, অসঙ্গতি দল করার জন্য আর এখন যুবকরা কাজ করে নিজেদেরকে প্রকাশ করার জন্য।

বর্তমানে সমাজকর্মী (ফেইসবুক)-দের ব্যাপারে অবশ্য অনেকের দ্বিমত আছে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে যদিও এদেরকে কেউ চিনে না, জানে না। তবে একটা নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এদেরকে ঠিকই চিনে, জানে। দেশের বাইরে বসবাসরত একজন কমিউনিটি নেতাকে বলতে শুনেছি, ‘এখনকার সময়ে স্বার্থ ছাড়া কেউ কিছু করে না। এরকম দুই-একজন সমাজকর্মী না থাকলে আমাদের বিভিন্ন কাজ করার যুবক খোঁজে পাওয়া যাবেনা। এরা কাজ করে আমাদের পাঠানো টাকার একটা অংশের লোভে আর আমরা আমাদের সংগঠনের কাজটাও এদের দিয়ে সারিয়ে নিতে পারছি।’

তারা বলেন – কথাটা গায়ে লেগেছে। কারণ, আমিও যুবক। আমিও সমাজের জন্য কাজ করতে চাই। কিন্তু এমন অপমান মেনে নিতে পারিনি। অবশ্য বয়সে উনি আমার বাবার বয়সী তাই প্রতিবাদ করারও প্রয়োজন বোধ করিনি। একজন প্রশাসনের কর্মকর্তাকে বলতে শোনেছি, ‘তাঁদের অনেক কর্মকাণ্ড সমাজের পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে’।

আমার জানামতে, ৪-৫ বছর আগে একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে একজন ক্যান্সার রোগী মানুষের জন্য টাকা উত্তোলন করে চিকিৎসার জন্য তাঁর পরিবারকে দেয়া হয়। সেই উত্তোলিত টাকার একটা বিশেষ অংশ সেই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছে এখনো গচ্ছিত আছে। কিন্তু তিনি সেই টাকার কোন হিসেব কিংবা অস্তিত্ব কাউকে জানাচ্ছেন না। এভাবে হয়তো অনেকেই এরকম বিভিন্ন সমাজকর্ম করে অব্যবহৃত টাকা নিজের মনে করে গচ্ছিত রেখে দেন। কিন্তু এর হিসেব কাউকে দিচ্ছেন না। এরকম সমাজকর্মীদের সংখ্যা এখন দিনদিন বাড়ছে।

বলা বাহুল্য, সমাজের কাজ করতে গিয়ে অনেক যুবকের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। তাঁদের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিবাহিত হয় মানুষের উপকারে ব্যয় করে। এই মহান কর্মে যে বা যারাই কাজ করে তাদের সম্মান জানানো আমাদের কর্তব্য। কিন্তু প্রকৃত সমাজকর্মের আড়ালে নিজেদের আখের গোঁচাতে যে বা যারা ব্যস্ত তাদের প্রতি ঘৃণা জানানোর ভাষা আমার মস্তিষ্ক সংগ্রহশালায় নাই।

#আরাফাত হোসেন, সিলেট প্রতিনধি।

Agami Soft. - Inventory Management System

পাঠকের মতামত