সাকিবের জন্যই খারাপ লাগছে!!

শেষটা আর রাঙানো হল না। গতকাল বাংলাদেশ ক্রিকেট বিশ্বকাপ-২০১৯ এর শেষ ম্যাচে মাঠে নেমেছিল। সেমিফাইনালে যাওয়ার স্বপ্নতো আগেই ভেঙ্গে গিয়েছিল। তাই গতকালের ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য ছিল শুধু নিয়ম রক্ষার ম্যাচ। যদিও শেষ ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৯৪ রানের বিশাল ব্যবধানে হারতে হয়েছে টাইগারদের।

এরই সাথে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ মিশনের সমাপ্তি টানতে হল। তবে বিশ্বকাপ থেকে যেতে যেতে বিরত্বের ছাপ রেখে বাংলাদেশের তথা বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। বিশ্বকাপের তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে করেছেন ৬০০ এর বেশি রান। সেমিফাইনাল না খেলেও চলতি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। যদি সেমিফাইনাল খেলার সুযোগ থাকতো, তাহলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে টেন্ডুলকারের এক টুর্নামেন্টে করা ৬৭৫ রানের রেকর্ডটিও নিজের করে নিতে পারতেন রেকর্ড আল হাসান।

অথচ সেমিফাইনাল না খেলেই দেশে ফিরতে হবে সাকিব আল হাসানকে! ম্যাচশেষে তাই সাকিবের জন্য সহানুভূতি জানালেন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। এবারের বিশ্বকাপকে এক কথায় ‘সাকিব আল হাসানের বিশ্বকাপ’ বললে বোধ হয় খুব একটা বাড়িয়ে বলা হবে না। ব্যাটে-বলে সমানভাবে রাঙিয়ে যাচ্ছেন বিশ্বকাপকে। প্রায় প্রতি ম্যাচেই রেকর্ড বইয়ের পাতায় কিছু না কিছু ওলট-পালট এনেছেন।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের স্বপ্নকে বলতে গেলে অনেকটা একা হাতেই টেনেছেন। তবুও ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, সেমিফাইনালের আগেই দেশে ফেরার উড়োজাহাজ ধরতে হচ্ছে তাঁকে! সাকিবের জন্য তাই খারাপ লাগারই কথা। এত চেষ্টা করেও যে দলকে সেমিফাইনালে তুলতে পারলেন না!

খারাপ মাশরাফি বিন মুর্তজারও লাগছে। সাকিব নিজের সর্বোচ্চটা নিংড়ে দিয়েছেন, কিন্তু তারপরেও খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে তাঁকে। দলের বাকিরা যদি আরেকটু সমর্থন দিতে পারতেন, সাকিবের সঙ্গী হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়তে পারতেন, তাহলে হয়তো বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স দেখানোর পরেও নকআউট পর্বের আগে বিদায় নিতে হতো না বাংলাদেশ ক্রিকেটের পোস্টারবয় সাকিবকে!

ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এসে সাকিবের কাছে দলের বাকিদের পক্ষ হয়ে তাই প্রকারান্তরে ক্ষমাই চেয়ে নিলেন অধিনায়ক মাশরাফি – শেষ দুই ম্যাচে সাকিব এত ভালো ব্যাটিং করেছে, কিন্তু আমরা জুটি দাঁড় করাতে পারিনি। দুটো ম্যাচই ৫০-৫০ ছিল, ভেবেছিলাম আমরা তাড়া করতে পারব। কিন্তু কোনো জুটিই গড়তে পারিনি আমরা। সাকিবের জন্য ভীষণ খারাপ লাগছে আমার। আমরা বাকি যারা আছি তারাও যদি এগিয়ে আসতে পারতাম, তাহলে হয়তো চিত্রটা ভিন্ন রকম হতো। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে সাকিব অসাধারণ ছিল। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং—কোন বিভাগে পারফর্ম করেনি!’

পুরো টুর্নামেন্টেই বাংলাদেশের ফিল্ডিং ছিল দৃষ্টিকটু। হাতের ফাঁক গলে বল বেরিয়েছে অসংখ্যবার, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ক্যাচ মিস করার মূল্য দিতে হয়েছে ম্যাচ হেরে। শেষ ম্যাচেও ছন্নছাড়া ফিল্ডিংয়ের অবস্থা চোখে লেগেছে খুব বেশি। ব্যাটিংয়ের প্রশংসা করলেও মাশরাফি নিজেও খুশি হতে পারেননি ফিল্ডিং নিয়ে, ‘আমাদের ব্যাটিং ভালো হয়েছে। কিন্তু ফিল্ডিংটা ভালো হয়নি। কিছু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বাজে ফিল্ডিংয়ের খেসারত দিতে হয়েছে আমাদের।’

ফিল্ডিংয়ের পাশাপাশি বোলিংয়ের অবস্থাও নাজেহাল। নখদন্তহীন বোলিং নিয়ে বেশির ভাগ ম্যাচেই প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের মনে ভয় ধরাতে পারেননি বাংলাদেশি বোলাররা। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও মোস্তাফিজুর রহমান ছিলেন স্বমহিমায় উজ্জ্বল। পুরো টুর্নামেন্টে ২০ উইকেট নিয়েছেন এ বাঁহাতি পেসার। শেষ দুই ম্যাচেই নিয়েছেন পাঁচটি করে উইকেট। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বকাপে টানা দুই ম্যাচে পাঁচ উইকেট পেয়েছেন, বাংলাদেশিদের মধ্যে এক আসরে সবচেয়ে বেশি উইকেটের রেকর্ডও এখন তাঁর।

বোলিং নিয়ে হতাশা থাকলেও মোস্তাফিজকে প্রাপ্য প্রশংসাটুকু দিতে কার্পণ্য করেননি অধিনায়ক, ‘ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই মোস্তাফিজ অপ্রতিরোধ্য। মাঝে ইনজুরিতে পড়েছিল বলে কিছুদিন ফর্মে ছিল না। কিন্তু আয়ারল্যান্ড সফর থেকেই ও ভীষণ ভালো বল করছে। আশা করছি ভবিষ্যতে আর কোনো ইনজুরি ওর ক্যারিয়ারে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য সত্যিকারের এক সম্পদ ও।

এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ গিয়েছিল অন্তত সেমিফাইনাল খেলার লক্ষ্য নিয়ে। দিন চারেক আগে পর্যন্তও সেই সম্ভাবনা টিকে ছিল। কিন্তু শেষ দুই ম্যাচে হেরে বিশ্বকাপ শেষ করতে হচ্ছে সপ্তম স্থানে থেকে। দক্ষিণ আফ্রিকা যদি অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দেয়, তাহলে তো নেমে যেতে হবে আটে। বিশ্বকাপটা কেমন কাটল বাংলাদেশের?

এমন প্রশ্নের উত্তরে মাশরাফি বুঝিয়ে দিলেন, প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল না পাওয়ায় হতাশ তারা – আমরা সন্তুষ্ট নই। বিশ্বকাপটা আরও ভালোভাবে শেষ করতে পারতাম। দিন শেষে আমাদের বিশ্বকাপকে ৫০-৫০ বলতে হবে। আমরা নিজেদের শতভাগ দিয়েছি, কিন্তু মাঝে মাঝে ভাগ্যটাও দরকার হয়। ভাগ্য এ টুর্নামেন্টে আমাদের পাশে ছিল না।’

পুরো বিশ্বকাপ জুড়েই সমর্থন ও ভালোবাসা দিয়ে যাওয়ার জন্য সমর্থকদেরও ধন্যবাদ জানালেন মাশরাফি, ‘যারা মাঠে এসে সমর্থন দিয়েছেন এবং দেশে যারা সমর্থন দিয়েছেন, সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। আমাদের সমর্থকেরা সব পরিস্থিতিতে আমাদের সমর্থন দেন। আশা করছি আগামী বার আমরা তাদের খুশি করতে পারব।’

আগামী বিশ্বকাপ খেলবেন না নিশ্চিতভাবেই, কিন্তু এটিই কি মাশরাফির শেষ ম্যাচ হয়ে থাকল? উত্তরটা পরিষ্কারভাবে দিলেন না পুরো বিশ্বকাপে মাত্র একটি উইকেট পাওয়া মাশরাফি, ‘দেশে ফিরে ক্যারিয়ার নিয়ে আরেকবার ভাবব। এরপরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে পারব।’

পাঠকের মতামত