শবে কদর নিয়ে জানা অজানা কিছু তথ্য

হাজার মাসে থেকেও শ্রেষ্ঠ হচ্ছে লাইলাতুল কদর বা শবে কদরের রাত। আরবিতে লাইলাতুল অর্থ হলো রাত বা রাত্রি এবং কদর অর্থ সম্মানা, মর্যাদা বা মহাসম্মান। ইসলাম ধর্ম অনুসারে, এ রাতে ইসলামের মহানবী, মুহাম্মদের অনুসারীদের সম্মান বৃদ্ধি করা হয় এবং মানবজাতির ভাগ্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়। তাই মুসলমানদের কাছে এই রাত অত্যন্ত পুণ্যময় ও মহাসম্মানিত হিসেবে পরিগণিত। কুরানের বর্ননা অনুসারে, আল্লাহ এই রাত্রিকে অনন্য মর্যাদা দিয়েছেন এবং এই একটি মাত্র রজনীর উপাসনা হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও অধিক সওয়াব অর্জিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

শবে কদর উপলক্ষ্যে আল্লাহ কোরআনে ঘোষণা করেছেন – নিশ্চয়ই আমি তা (কোরআন) অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে। আর কদরের রাত সম্বন্ধে তুমি কি জানো? কদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেশতারা ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, বিরাজ করে উষার আবির্ভাব পর্যন্ত। (সূরা আল-কদর, আয়াত ১-৫)।

অপর একটি আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন – হা-মীম! শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের, নিশ্চয়ই আমি তা (কোরআন) এক মুবারকময় রজনীতে অবতীর্ণ করেছি, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়। (সূরা আদ-দুখান, আয়াত: ১-৪)।

প্রতিবছর মাহে রমজানে এই মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদর মুসলিমদের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনে বলে মুসলিম ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস। শবে কদরের জন্য নির্দিষ্ট কোন দিন নির্ধারিত নেই। তবে হযরত মোহাম্মদ (সা:) বলেছেন – তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে শবে কদরকে সন্ধান করো। (মুসলিম)। এ রাতগুলো হলো ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯।

মুহাক্কিমগণরা বলেন – আরবিতে ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দটি নয়টি হরফ দিয়ে লিখা হয়। অপরদিকে সূরা কদরে ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দটি তিনবার উল্লেখিত আছে। যদি নয়কে নয় দিয়ে গুণ করা হয় তাহলে সাতাশ হবে, তাই সাতাশ রমজান লাইলাতুল কদরের রাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে প্রবল। তবে নিশ্চিভাবে বলা যাবে না যে, আজকেই শবে কদর।

এই রাতের মর্যাদা হাজার রাতের চেয়েও বেশী। এই রাতে আল্লাহ তায়ালার নূরের ফেরেশ্তাগণ পৃথীবিতে নেমে আসেন। মুমিনদের ইবাদাত প্রত্যক্ষ করেন। তাদের জন্য রহমতের দোয়া করেন। এক হাদিসে রাসুল (সা:) বলেন – যে ব্যক্তি কদর রজনীতে ঈমান ও এহলাস সহকারে ইবাদাত করবে তার আগের পাপসমূহ মিটিয়ে দেয়া হবে। (বুখারী, হাদীস নং ২/৭০)।

রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের যেকোন একটি বেজোড় রাত হতে পারে শবে কদর। হাদিসের আলোকে ইসলামের আলেমগণ শবে কদরের রাতের কিছু নির্দশন তুলে ধরেন। এমনকিছু আলামত দেখা গেলে শবে কদর নাজিল হয়েছে বলে মনে করা হয়।

শবে কদর রাতের কিছু নিদর্শন:

* ঐ রাতে বৃষ্টি বর্ষণ হতে পারে।

* শবে কদর রাতটি গভীর অন্ধকারে ছেয়ে যাবে না।

* শবে কদরের রাতে মৃদুমন্দ বাতাস প্রবাহিত হতে থাকবে।

* রাতটি নাতিশীতোষ্ণ হবে। অর্থাৎ গরম বা শীতের তীব্রতা থাকবে না।

* কোন ঈমানদার ব্যক্তিকে আল্লাহ স্বপ্নে হয়তো তা জানিয়েও দিতে পারেন।

* সকালে হালকা আলোকরশ্মিসহ সূর্যোদয় হবে। যা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মত।

* শবে কদরের রাতে ইবাদত করে মানুষ অপেক্ষাকৃত অধিক তৃপ্তিবোধ করবে।

শবে কদর রাতে বিভিন্ন আমল আছে, তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বেশী বেশী নফল নামাজ আদায় করা। কোরআন তেলওয়াত করা। বেশি বেশি এস্তেগফার করা। লাইলাতুল কদরের রাতে করণীয় সম্পর্কে রাসুল (সা:) হযরত আয়েশা (রা:) কে আল্লাহর নিকট গোনাহ মাফের দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন।

দোয়াটি হল :- আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আ`ফুওয়ুন; তুহিব্বুল আ`ফওয়া; ফা`ফু আন্নি। (অর্থ:- হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল; ক্ষমা করতে ভালো বাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিজি, মিশকাত)। তাই বেশি বেশি করে এই দোয়া পাঠ করে আল্লাহর কাছে মাফ চেয়ে নেওয়া উচিৎ।

শবে কদরের অন্যান্য আমলের মধ্যে কবর জিয়ারত করা, নিজের জন্য, প্রতিবেশিদের জন্য, আত্মীয়-স্বজনের জন্য, পিতা-মাতার জন্য, বন্ধু-বান্ধব ও সকল মুমিন বান্দাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি কামনা করে দোয়া করা।

তবে শুধু ২৭ রমজানকে শবে কদর ভাবা একদমই অনুচিৎ। যেহেতু হাদিসে শেষ ১০ রমজানের যেকোন একটি রাত হতে পারে শবে কদর। তাই সবার উচিত ১০ রমজানের বেজোড় রাতগুলোতে বেশি বেশি ইবাদাত করা।

পাঠকের মতামত