এই গরমে সুস্থ্য থাকতে তিন অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শগুলো জেনে নিন

প্রতিকী ছবি।

এখন দেশের সর্বত্র গরমে প্রাণ উষ্ঠাগত। তার উপর চলছে পবিত্র রমজান। সারাদিন রোজা রেখে ইফতারে ভাজাপোড়া খেয়ে রোজাদারদের শরীর খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে। হঠাৎ করে দেখা দিচ্ছে পেটে সমস্যা। দিনে দুই থেকে তিনবার পাতলা পায়খানা। যদি এমনটা হয় তাহলে ধরে নিতে হবে ডায়রিয়া হয়েছে।

ডায়রিয়ার সমস্যা নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন ডায়রিয়া মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. রাজাশিস চক্রবর্তী

ডায়রিয়া হওয়ার পিছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। তবে সাধারণত পরিপাকতন্ত্রে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবী সংক্রমণের কারণেই ডায়রিয়া হয়ে থাকে। আর এই ব্যাকটেরিয়া ছড়ায় পানির মাধ্যমে। এই সময় ব্যাপক হারে ডায়রিয়ার প্রধান কারণ রোটা ভাইরাস, কখনও কখনও নোরো ভাইরাস। পাতলা পায়খানার সঙ্গে রক্ত গেলে বা প্রবল জ্বর দেখা দিলে তা ভাইরাস নয়, বরং ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবী সংক্রমণের কারণে হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে।

দূষিত পানি পান করার মাধ্যমে এ রোগ হয়। শহরে ট্যাপের পানি অনেক সময় সেপটিক ট্যাংক বা সুয়ারেজ লাইনের সংস্পর্শে দূষিত হয়। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর ও অপরিচ্ছন্ন জীবনযাপন, যেখানে-সেখানে ও পানির উৎসের কাছে মলত্যাগ, সঠিক উপায়ে হাত না ধোয়া, অপরিচ্ছন্ন উপায়ে খাদ্য সংরক্ষণ এবং ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে এ সময় দোকান, রেস্তোরাঁ বা বাসায় ফ্রিজের খাবারে পচন ধরা ইত্যাদি ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ।

ডায়রিয়া হলে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে যায় এবং রক্তে লবণের তারতম্য দেখা দেয়। এই দুটোকে রোধ করাই ডায়রিয়ার মূল চিকিৎসা। প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর অন্তত দুই গ্লাস খাবার স্যালাইন পান করুন। সঠিক পদ্ধতিতে বিশুদ্ধ পানি দিয়ে ও হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে এই স্যালাইন তৈরি করতে হবে।

পাতলা পায়খানার সঙ্গে রক্ত, জ্বর, প্রচণ্ড পেটব্যথা বা কামড়ানো, পিচ্ছিল মল, মলত্যাগে ব্যথা ইত্যাদি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করুন। যথেষ্ট প্রস্রাব হচ্ছে কিনা, লক্ষ করুন। প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, চোখ গর্তে ঢুকে যাওয়া বা জিব, ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া পানিশূন্যতার লক্ষণ। এসব লক্ষণ দেখা দিলে বা বমির কারণে পর্যাপ্ত স্যালাইন না খেতে পারলে শিরায় স্যালাইন দেয়ার জন্য হাসপাতালে যান।

এছাড়াও এই গরমে আরো কয়েকটি শারীরিক সমস্যা হতে পারে, যেমনঃ- ঘুমে সমস্যা, ভাইরাস জ্বর ইত্যাদি। এ সময় ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী চলা উচিৎ। আসুন জেনে নিই ঘুমের সমস্যা ও ভাইরাস জ্বর দেখা দিলে ডাক্তারগণ কি পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

ঘুমের সমস্যা নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আহসান উদ্দিন আহমেদ

জীবনের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি সময় আমরা ঘুমাই। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ৪ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম স্বাভাবিক এবং ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা ঘুম হল আদর্শ। যারা ৯ ঘণ্টা বা তারও বেশি ঘুমান, তাদের মধ্যে বিভিন্ন অসুখের প্রবণতা বেশি। গরমে ও রোজায় সিয়াম সাধনার কারণে আমাদের ঘুমের সময় ও ধরণ পরিবর্তিত হয়। ঘুমে ব্যাঘাত যে কারণে হয়েছে তার চিকিৎসাই প্রথমে করা হয়। এ জন্য আলাদা করে কিছু বিশেষ ওষুধ দেয়া হয়।

* খুব বেশি উত্তেজিত হয়ে বিছানায় যাবেন না।

* প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করুন।

* ঘুমাতে যাওয়ার আগে সিগারেট, তামাক, চা, কফি না খাওয়াই ভালো।

* ঘুমের আগে কোনো ভারি কাজ বা অত্যাধিক ব্রেইনওয়ার্ক করা থেকে বিরত থাকুন।

* দুপুরের ঘুম শুধু কর্মক্ষমতাই কমায় না, আপনার রাতের ঘুমও নষ্ট করে। অতএব, এটি বাদ দিন।

* ঘুমাতে যাওয়ার সময় সারাদিনের ক্লান্তি, বিপর্যয় বা উত্তেজনার কারণগুলো নিয়ে চিন্তা করবেন না।

* দুই-এক দিনের ঘুম না হওয়াতে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না। নিয়মিত ঘুম না হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

* শোয়ার আগে এক গ্লাস দুধ খেতে পারেন। দুধে থাকে ট্রিপটোফ্যান যা আপনাকে ঘুমাতে সাহায্য করবে।

* নিয়মিত গোসল এবং শুতে যাওয়ার আগে আরামবোধের জন্য ঘাড়, মুখ ও পা পানি দিয়ে মুছে নিতে পারেন।

* বিছানা শুধু ঘুমের জন্যই নির্দিষ্ট করে রাখুন। বিছানায় বসে টিভি দেখা, আড্ডা দেয়া, খাবার খাওয়া বন্ধ করুন।

* খালি পেটে কখনও শুতে যাবেন না। রাতে গুরুভোজ করবেন না। বেশি ভরা পেটে শুতে যাওয়া ঠিক নয়। আবার খেয়েই সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়াটা অনুচিত। খাওয়া ও শোয়ার মধ্যে সময়ের পার্থক্য রাখুন।

ভাইরাস জ্বর নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আবু সাঈদ শিমুল

* ভাইরাসজনিত জ্বরে ভোগেননি এমন মানুষ এসময়ে কমই পাওয়া যাবে। ডেঙ্গু, জন্ডিসসহ যে কোনো ভাইরাসজনিত জ্বরকে ‘ভাইরাস জ্বর’ বলা হলেও সাধারণভাবে লোকজন ভাইরাস জ্বর বলতে ‘ফ্লু’কেই বোঝায়। এ জন্য প্রধানত দায়ী ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস।

* ভাইরাস আক্রমণের দুই থেকে সাত দিন পর এ জ্বর হয়। জ্বর হলে শীত শীত ভাব, মাথাব্যথা, শরীরে ও গিরায় ব্যথা, খাওয়ায় অরুচি, ক্লান্তি, দুর্বলতা, নাক ও চোখ দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া, চুলকানি, কাশি, অস্থিরতা ও ঘুম কম হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে পেটের সমস্যা, বমি ও ডায়রিয়া হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে টাইপ ‘বি’ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণে পেটব্যথাও হতে পারে।

* তিন প্রকার ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের অনেক উপজাতি আছে, যারা অনবরত চরিত্র বদলায়। তাই উল্লিখিত লক্ষণগুলোর প্রতিটি সব রোগীর যে থাকবে তা নয়, আবার একেক রোগীর ক্ষেত্রে এর তীব্রতাও একেক রকম হতে পারে।

* কারও হয়তো তিন দিনেই জ্বর ভালো হয়ে গেল, কারও আবার ১০ থেকে ১৪ দিনও লাগতে পারে। ভাইরাস জ্বর বাতাসের মাধ্যমে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি থেকে হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে ঠাণ্ডা লেগে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে এ রোগ হয়। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত।

* ভাইরাস জ্বর হলে খুব বেশি চিকিৎসার বা কোনো অ্যান্টিবায়োটিকেরও প্রয়োজন হয় না। লক্ষণ অনুযায়ী জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল খেলেই হয়। প্রচুর পানি খেতে হবে এবং সেই সঙ্গে বিশ্রাম নিতে হবে। রাতে ঘুমানোর চেষ্টা করতে হবে। অনেকে মনে করেন, ভাইরাস জ্বরে গোসল করা যাবে না। এটা সম্পূর্ণ ভুল।

* এ জ্বরে গোসল করতে বাধা নেই। শিশুদের ক্ষেত্রে শরীর মুছে দেয়া ভালো। এ সময় দরজা, জানালা ও ফ্যান বন্ধ করে ঘরকে গুমট করে রাখা উচিত নয়। বরং জানালা খুলে হালকা ফ্যান ছেড়ে দেয়া ভালো।

* সাধারণত কয়েক দিনেই ভাইরাস জ্বর ভালো হয়ে গেলেও এর ফলে শরীরে যে ক্লান্তি ও অবসাদ আসে, তা দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তাই এ রোগ ভালো হলেও কয়েক সপ্তাহ অবশ্যই পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে।

* মনে রাখবেন ভাইরাস জ্বর একটি সাধারণ রোগ হলেও প্রাথমিক অবস্থায় অন্য অনেক জ্বরের লক্ষণ ভাইরাস জ্বরের মতোই। তাই জ্বর তিন দিনের বেশি স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এ ছাড়া অতি বৃদ্ধ ব্যক্তি, সন্তানসম্ভবা নারী কিংবা খুব ছোট শিশুদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।

পাঠকের মতামত