ইরান-মার্কিন যুদ্ধ কয়েক দশকের জন্য হুমকি হিসেবে আসছে!

ইরান-মার্কিন উত্তেজনা ভয়ংকর ঝড়ে রূপ নিতে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ হতে যাচ্ছে। তবে এই যুদ্ধে দুটি অঞ্চলই চরম বিপর্যয়ের কবলে পড়বে। এ ছাড়া ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে ট্রাম্প প্রশাসন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা অন্তত এমন দাবিই করছেন।-খবর আরটি অনলাইনের

ইরানের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ পরিকল্পনার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। যাতে মধ্যপ্রাচ্যে এক লাখ ২০ হাজার সেনা মোতায়েন করারও কথা রয়েছে। অজ্ঞাত সূত্রের বরাতে মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস এমন খবর দিয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সেনা পাঠানোর খবর উড়িয়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু তিনি বলেছেন – যদি তিনি এমনটি করেন, তবে তাতে টাইমসের উল্লেখিত সেনার চেয়েও আরও বেশি সংখ্যক মোতায়েন করবেন।

তবুও ওয়াশিংটন সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহ ও দিনে পর্যাপ্ত যুদ্ধালোচনা করেছে। বিশ্ব ভ্রমণে বের হওয়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও প্রতিটি স্টপেজে নেমে ইরানকে হুমকি দিচ্ছেন। একই সময় ইরাকের মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গিয়েও তিনি একই ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছেন। পম্পেও বলেই যাচ্ছেন – যুক্তরাষ্ট্র কোনো যুদ্ধ চায় না। কিন্তু ইরান কিংবা আড়ালে থাকা দেশটির ছায়া বাহিনী মার্কিন নাগরিক এবং স্বার্থের ওপর হামলা চালানোর চেষ্টা করলে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে জবাব দিতে প্রস্তুত ওয়াশিংটন।

পম্পেও যখন এভাবে একঘেঁয়ে বকবক চালিয়ে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই রোববার যুক্তরাষ্ট্রগামী চারটি তেল ট্যাংকারে নাশকতামূলক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে দুটি ইরানের চিরবৈরী সৌদি আরবের, একটি নরওয়ের ও একটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের। যদিও এতে কেউ আহত হননি, কোনো তেল উপচে পড়েনি এবং কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানকে দায়ী করেনি। কিন্তু অনানুষ্ঠানিকভাবে এমন প্রতিবেদন রয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সুবিধাজনক অপরাধীর ঘাড়েই দোষ চাপাচ্ছেন। এ ঘটনার জন্য ইরান দায়ী কিনা, তা নিশ্চিত না হয়েই বলে বসেছে যে, যদি তেহরান এমন কিছু করে থাকে, তবে তাদের জন্য মারাত্মক ভোগান্তি রয়েছে।

এতে মূলধারার গণমাধ্যমের বিশ্লেষকরা কিছুটা হলেও যুদ্ধের সতর্কতা অনুভব করছেন। এই বুঝি যুদ্ধ আসছে, বলে মনে করছেন তারা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনের ভেতর সুপ্ত জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসনের মতো পরিস্থিতি সত্ত্বেও মার্কিন রাজনীতিবিদদের মধ্যে প্রভাবশালী সমালোচনামূলক কণ্ঠ নেই বললেই চলে। ইরাক যুদ্ধে চার লাখ লোক নিহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে চার হাজার মার্কিন সেনা রয়েছেন। আর এতে কোটি কোটি ডলার খেসারত দিতে হয়েছে।

এদিকে ট্রাম্প নিজের আরেকটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে যাচ্ছেন। বিদেশের মাটিতে মার্কিন বোধজ্ঞানহীন লড়াইয়ের অবসান ঘটানোর কথা বলেছিলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের বহু সমালোচক থাকলেও এক্ষেত্রে কেউ-ই কঠোরভাবে মুখ খুলছেন না। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্ররা ঝুঁকিতে পড়ে যাবে। বিশেষত, সৌদি আরব ও ইসরাইল। কিন্তু আঞ্চলিক ও অন্যান্য ঝুঁকি সত্ত্বেও পম্পেও ও বোল্টন ইরানের সরকারের পরিবর্তন আনতে কঠোর হয়েছেন।

এসব কিছুকে সাম্রাজ্যবাদী দম্ভ বলে মনে করেন সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও রিপাবলিকান সিনেটের নীতি উপদেষ্টা জেইমস জাট্রাস। তিনি বলেন – যদিও ইরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে ওয়াশিংটন ভালোভাবেই জানে। কিন্তু হোয়াইট হাউসে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন, যারা অতি ঔদ্ধত্য। তারা যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রতিরোধ্য শ্রেষ্ঠত্ববাদে বিশ্বাসী। তাদের ধারণা, ইরান একটি কাগুজে বাঘে রূপ নিয়েছে।

এ ছাড়া ইরানি শত্রুদের ওপর মার্কিন হামলায় দীর্ঘমেয়াদী লাভবান হওয়ার আশা করছে সৌদি আরব ও ইসরাইল। কিন্তু এটা শতভাগ নিশ্চিত যে, যদি ওয়াশিংটন হামলা করেই বসে, তবে ইরানও পাল্টা এই সুবিধাবাদী দুই দেশ সৌদি ও ইসরাইলে আঘাত হানবে। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক ফুয়াদ ইজাদি বলেন, সংঘাতের কারণে ইরান যদি সৌদি ও ইসরাইলে হামলা করতে বাধ্য হয়, তবে সর্বশেষ মার্কিন সেনা হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাইবে ইসরাইল ও সৌদিরা।

এ মন্তব্য আরেকটি বিপর্যকর সরকার পরিবর্তনের যুদ্ধ শুরু করার আগে আমেরিকান নাগরিক ও গণমাধ্যমবোদ্ধাদের উল্লাসে কিছুটা হলেও বাধ সাধতে পারে। ইরাকযুদ্ধে কিছুটা হলেও টের পেয়েছেন তারা। রুশ একাডেমি অব সায়েন্সের প্রাচ্যশিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউটের ইরান সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক ভ্লাদিমির সাজিন বলেন, যা ঘটছে তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের একটি সর্বনাশা যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তিনি বলেন, এতে কেউ জয়ী হবে না। একটা বড় যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের জন্য বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে।

সাজিনের মতে – ওয়াশিংটন ও তেহরান পরস্পর দুই দেশের সেনাবাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে ঘোষণা করেছে। কাজেই যুদ্ধ বেধে যাওয়ার নানা অজুহাত রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত যা ঘটছে, তাকে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বলেই মনে হচ্ছে। তবে যুদ্ধ হতে পারে, ইরান যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার হুমকি কার্যকর করে বসে। ইরান যদি সেটা করে, সামরিক শক্তি ছাড়া এমনটা করা কঠিন কিছু না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা অলস বসে থাকবে না। তারা হামলা করে বসবে।

সাজিন বলেন – তবে সেটা বড় ধরনের যুদ্ধাবস্থার দিকে যাবে না। কারণ ওয়াশিংটন ও তেহরান জানে যে, বড় যুদ্ধ তাদের জন্য কোনো ভালো ফল বয়ে আনবে না। তবে আঘাতের প্রশ্ন আসলে ইরানের সুযোগ একেবারে কম। কারণ দেশটির স্থলবাহিনী যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের প্রতিরোধ করতে পারবে না। তবে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা রয়েছে, যা এ অঞ্চলের প্রতিটি ইসরাইলি ও মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানতে পারবে। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভালো।

এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা জোরদার করেছে। কেবল সমুদ্রেই খারাপ অবস্থার মুখোমুখি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। কারণ দাও বলে পরিচিত ইরানের এক ঝাঁক ছোট দ্রুতগতির নৌকা আছে। যা দিয়ে শত্রুপক্ষকে বেকায়দায় ফেলে দিতে পারবে দেশটি।

পাঠকের মতামত