ইয়েমেন সংকট : সব ক্ষোভ শুধু শিশুদের উপর?

ছবি: প্রতি ১২ মিনিটে মারা যাচ্ছে একটি শিশু। সে হিসেবে মাসে ৬০০টি শিশু।

একটা সত্য কথা না বললেই নয়, ধর্ষণ, খুন, ধ্বংস করার মধ্যেও একটা সৌন্দর্য আছে। অন্ধকারের এইসব ছবিগুলোর সাথে ব্যাকগ্রাউন্ডে গিটারে কোলাজ যুক্ত করে দিলেই একটি শৈল্পিক রূপ ফুটে উঠবে। তখন মনে হবে ধর্ষণ, খুন, ধ্বংস এগুলো শুধু উপভোগ করার জন্য তৈরি হয়েছে। তখন এই কালো সৌন্দর্যগুলো দেখলে মন খারাপ জন্মায়। মনের মধ্যে উহু, আহা, ইশ’র মত ব্যাথা অনুভুত হয়। পরক্ষণেই মদের গ্লাসে চুমুক দিলে অন্ধকার কালো ছবিগুলো গাড় নীলের মত দেখাবে। এমন বিলাসিতা উপভোগ করার মত মানুষও এই পৃথিবীতে আছে। এমন শখ যাদের আছে তারা ইয়েমেনের দিকে একটু চোখ রাখুন।

‘ইয়েমেন’ মধ্যপ্রাচ্যের সবথেকে গরীব দেশ হিসেবে ধরা হয় এটিকে। শুধু এইটুকুতেই নয়, মানব ইতিহাসের সবথেকে প্রাচীন বসতিগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ইয়েমেন। দেশটির অবস্থা বর্তমানে এতো খারাপ যে, সেখানে এক কাপ দুধ আর একটি রুটি পাওয়াকে বিলাসিতা হিসেবে ধরা হয়। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া যুদ্ধ যেন এখনো চলছে ইয়েমেনে। গৃহযুদ্ধে দেশটি পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

ধর্ষণ, দুর্ভিক্ষের মত বিপর্যয়ে দেশটির মানুষগুলো এখনো মরছে। তবে বেশি বিপর্যয় যাচ্ছে নিষ্পাপ শিশু গুলোর উপর। শুধু ২০১৭ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ি, ইয়েমেনে সে বছর ৪০ হাজার শিশু মারা গেছে। আর সে সংখ্যাটা এখন আরো বেড়েছে। ২০১৫ থেকে ২০১৮, এই তিনটি বছর দেশটিকে UAE, কুয়েত, বাহরাইন, মিশর, মরক্কো, জর্ডান, সুদান এমনকি সেনেগালের মত দেশ হত্যা, গণধর্ষণের মত যজ্ঞ গড়ে তুলেছিল। আর তাদের সাথে হায়েনাদের মত মুখ লাগিয়েছে আইএস এবং আল-কায়দা।

Yemen Crisis

ছবি: খাবারের লোভ দেখিয়ে অস্ত্র তুলে দেওয়া হচ্ছে শিশদের হাতে।

যুদ্ধের ফলে দেশটিতে দেখা দিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানব-সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়। গত তিন বছরে ২ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার শিশু নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক। বর্তমানেও দেশটিতে রক্তারক্তি বন্ধ হয়নি। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ি, ইয়েমেনে প্রতি ১২ মিনিটে মারা যাচ্ছে একটি শিশু। সে হিসেবে শুধু একদিনেই মারা যাচ্ছে ২০টি শিশু, আর মাস শেষে সেটা দাঁড়ায় ৬০০ তে। এ ছাড়াও পাঁচ বছরের নীচের চার লাখ শিশু চরম অপুষ্টিতে ভুগছে, যা তাদের জীবনকে আরো ঝুঁকিতে ফেলছে।

খাদ্যদ্রব্যের অতিরিক্ত মূল্য বৃদ্ধি এবং সামরিক অবরোধের কারণে লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে থাকছেন দেশটিতে। কিন্তু টিভিতে এই ধরনের খবর প্রকাশ করাই হয় না। তারা এই যুদ্ধকে ভুলে গেছে। তবে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সৌদি আরবে কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করছে কিছু সংবাদ মাধ্যম। কারণ হুথি যোদ্ধাদের ওপর বোমা হামলা করতে সৌদি আরব সরকার ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন করছে। সরকারি বাহিনী হুথি যোদ্ধাদের সাথে যোদ্ধ করে যাচ্ছে কিছু পয়েন্টে। ফলে দেশটির দুর্ভিক্ষ কবলিত অঞ্চলটিতে খাবার সহযোগিতা পৌঁছাতে পারছে না।

Yemen Crisis

ছবি: পাঁচ বছরের নীচের চার লাখ শিশু চরম অপুষ্টিতে ভুগছে, যা তাদের জীবনকে আরো ঝুঁকিতে ফেলছে।

যুদ্ধ কবলিত অঞ্চলে বসবাস করা আব্দুল্লাহ নামের এক নাগরিক তার নিজের বসত বাড়ি ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন মারিব ক্যাম্পে। যুদ্ধ চলাকালে তিনি তার পরিবার ও স্বজনদের নিয়ে পালিয়ে যান নিজের জীবন বাঁচাতে। তিনি জানান, যুদ্ধাদের বুলেটে অথবা মাইনের আঘাত থেকে বাঁচতে পালিয়া আসা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না। আমাদের হাতে কোনো ধরেনের খাবার ছিলো না। ওই আঞ্চলে বসবাস করলে আমাদের না খেয়ে মরতে হতো। তাই আমরা বাধ্য হয়েই পালিয়ে এসেছি।

আব্দুল্লাহ আরো জানান, কিছু না খেয়ে ওই অঞ্চলে বসবাস করা অসম্ভব ছিলো। আমারা সবাই ক্ষুধার্ত ছিলাম। তাই আমাদের সবারই চলে আসা উচিত ছিলো। আবাক করার মতো বিষয় হলেও সত্যি যে, আমাদের হাতে যে খাবার ছিলো তা ছিনিয়ে নিয়ে যায় বিদ্রোহীরা।

Yemen Crisis

ছবি: ক্ষিদার জন্য কাঁদতে পারছেনা শিশু গুলো।

ইয়েমের সানায় একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন ব্রিট সুলতানা বেগম। যুদ্ধ কবলিত অঞ্চলের দুঃখজনক ঘটনাগুলো দেখেছেন তিনি। তিনি জানান, ইয়েমেনের মানুষ এখন না খেয়ে জীবনযাপন করছেন। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এই আবস্থার জন্য দায়ি মানুষই। এই ধারণা ভুল নয়। দেশটির ২০ মিলয়নেরও বেশি মানুষ না খেয়ে বসবাস করছেন। কোনো ধরনের মানবিক সহয়তা ছাড়াই বসবাস করেছেন তারা। খাবারের সহায়তা ছাড়া তারা যেকোনো সময় মারা যেতে পারেন। ইউনিসেফের আঞ্চলিক পরিচালক জিয়র্ট কাপপেলারি এই অবস্থাকে ‘জীবন্ত নরক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

Yemen Crisis

ছবি: বর্তমানে ইয়েমেনে এক কাপ দুধ আর একটি রুটি পাওয়াকে বিলাসীতা হিসেবে ধরা হয়।

ইয়েমেনে নিয়োজিত জাতিসংঘের মানবিক সহায়তার সমন্বয়কারী লিস গ্রান্ডে বলেন, ইথিওপিয়ার মতোই ইয়েমেনে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। ২১ শতাব্দীতে বসবাস করে এই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়া আসলেই দুঃখজনক। মানুষ হিসেবে এই ঘটনাগুলো সহ্য করার মতো নয়। ইয়েমেনে যা কিছুই ঘটছে, তা যেন আঞ্চলিক দেশগুলোরই ব্যাপার। তবে দেশটি অস্থিরতার মধ্যে থাকলে তা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য হামলার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।

Yemen Crisis

বিখ্যাত এই ছবিটির কথা মনে আছেতো সবার?

ইয়েমেনের আল কায়েদাকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠন বলে বলছে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। কারণ তাদের প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আছে। তবে ইয়েমেনের এই সংকটকে সৌদি আরব আর ইরানের মধ্যে আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াই হিসাবেও দেখা হচ্ছে। কৌশলগত ভাবে ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি বাব আল-মানডাবের ওপর বসে আছে, যা রেড সি আর গালফ অফ এডেনের সংযোগস্থল। এখান থেকেই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেলের সরবরাহ হয়ে থাকে।

চলবে……

#শুভ আহম্মেদ, বিডি৩৬০ নিউজ।

Agami Soft. - Inventory Management System

পাঠকের মতামত