বিএনপির ৫ নেতার শপথ নেওয়ার পিছনে আছে ৫টি কারণ!

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট ডাকাতি ও কারচুপির অভিযোগ এনে ফল বর্জন করেছিল বিএনপি। তাই তারা একাদশ সংসদের অধিবেশনে অংশ নিবেনা ভবলে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল। এমনকি এ ব্যাপার নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতারা অনড় ছিলেন। ওই সিদ্ধান্তের সূত্র ধরে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা বলে আসছিলেন, একাদশ নির্বাচনে জয়ী বিএনপির ছয় জনপ্রতিনিধির কেউ-ই শপথ নেবেন না। এমনকি তাদের কেউ সংসদের আশপাশে গেলেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইউটার্ন নেয় এক দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতার রাজনীতির বাইরে থাকা এ দলটি।

কিন্তু শপথ গ্রহণের শেষ দিনে সোমবার সন্ধ্যায় সংসদ ভবনে আচমকা হাজির হন বিএনপির চার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি।বিএনপির লাখ লাখ নেতাকর্মীকে অবাক করে তারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। এতদিন যারা শপথ নেবেন না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে আসছিলেন তারাই এদিন সংসদে যোগ দিয়ে জানান, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে শপথ নিয়েছেন।

সংসদে শপথ না নেয়ার বিষয়ে অনড় সিদ্ধান্ত থেকে হঠাৎ সরে আসায় দলটির ভেতরে এবং বাইরে চলছে নানা আলোচনা। সমালোচনাও শুনতে হচ্ছে শীর্ষ নেতাদের। স্থায়ী কমিটির বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সদস্য ফোন বন্ধ রেখেছেন কিংবা এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ এ সিদ্ধান্ত বদলের সুলোক সন্ধান করার চেষ্টা করছেন দলটির নেতাকর্মীরা।

বিএনপির প্রভাবশালী ও মধ্যম সারির বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশ কয়েকটি কারণে শেষ মুহূর্তে এসে শপথ গ্রহণ প্রশ্নে ইউটার্ন নেয় বিএনপি। হঠাৎ রাজনীতির এ বাঁক বদলের পেছনে বেশ কয়েকটি সম্ভাবনা ও যুক্তি সামনে রেখেছেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা।সেগুলো হচ্ছে- প্রথমত: নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথের বিষয়ে অনড় অবস্থান, দ্বিতীয়ত: দলীয় শৃংখলা, তৃতীয়ত: রাজপথের পাশাপাশি সংসদেও নিজেদের দাবি তুলে ধরার সুযোগ হাতে রাখা, চতুর্থত: দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা ও মুক্তি, পঞ্চমত: জনগণের রায়কে সম্মান দেয়া।তবে এগুলোর মধ্যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্ত থেকে বিরত না রাখতে পারার আশঙ্কা ও খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টিই শপথ নেয়ার বিষয়ে গুরুত্ব পেয়েছে দলীয় হাইকমান্ডের কাছে।

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমানের শপথ গ্রহণের পর পাল্টে যায় বিএনপির রাজনীতির দৃশ্যপট। জাহিদের এই সিদ্ধান্তে ধাক্কা খান বিএনপির হাইকমান্ড। বাকি ৪ জনের (মহাসচিব মির্জা ফখরুল ছাড়া) এ পথ থেকে ফেরাতে নানাভাবে চেষ্টা চালান দলের নীতিনির্ধারকরা।

নির্বাচিতদের সঙ্গে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পৃথক কথা বলেন। তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। রোববার সন্ধ্যায় নির্বাচিতদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। সেখানে স্কাইপে নির্বাচিতদের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান কথা বলেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

সংসদে না যাওয়ার ব্যাপারে তাদের অনুরোধ করেন। কিন্তু নির্বাচিতরা তাদের অবস্থানে অনড় ছিলেন। উল্টো তারা সংসদে যাওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। এরপর স্থায়ী কমিটির সদস্যরা নির্বাচিতদের নিয়ে পৃথক বৈঠক করেন। সেখানেও তাদের শপথ না নেয়ার আহ্বান জানানো হয়।

কিন্তু বৈঠকে পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। বৈঠকে তাদের অবস্থান দেখে স্থায়ী কমিটির অনেকেই সন্দেহ করেন তাদের শপথ থেকে বিরত রাখা যাবে না। এরপর স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন তারেক রহমান। নির্বাচিতদের মনোভাব তাকে অবহিত করেন। বৈঠকে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দলের সাংগঠনিক বিষয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দায়িত্ব দেয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা বলেন – রোববার রাতে স্থায়ী কমিটির বৈঠকেই তারেক রহমান শপথের পক্ষে কথা বলেন। তবে আলোচনায় স্থায়ী কমিটির সব নেতাই শপথের বিপক্ষে মতামত দেন। তবে তারা এ-ও বলেন, এই শপথের সঙ্গে যদি খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি থাকে, তাহলে তাদের আপত্তি নেই। আর যদি তা-ই হয়, তাহলে আরও আগে এ নিয়ে আলোচনা হল না কেন?

আগে খালেদা জিয়ার মুক্তির শর্ত দিয়ে এমপিরা শপথ নিতে পারত? জাহিদুর রহমানকে কেন বহিষ্কার করা হল? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে তারেক রহমান তাদের জানান, এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন।

সূত্র থেকে জানা যায়, দলের শৃঙ্খলা ধরে রাখতে এবং গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার স্বার্থেই শেষ মুহূর্তে সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এ ব্যাপারে দলের সিনিয়র নেতা ছাড়াও কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর পরামর্শ নেন তিনি। সবাই সংসদে যাওয়ার পক্ষে মত দেন।

সংসদে যোগ দেয়ার জন্য চেয়ারপারসনের সম্মতি আদায়ের ব্যাপারে তারেক রহমান নিজেই দায়িত্ব নিয়েছেন বলে সিনিয়র নেতাদের আশ্বস্ত করেন।এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন – ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটাই দলের সিদ্ধান্ত। আমরা এটা মানতে বাধ্য, এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। অথচ সপ্তাহ খানেক আগে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে গয়েশ্বর বলেছিলেন – বিএনপির নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথ তো দূরের কথা সংসদ ভবনের আশপাশে দেখা গেলেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সূত্র থেকে আরো জানা যায়, নির্বাচিত চারজন শপথ নিতে যাচ্ছেন সোমবার সকাল থেকেই এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। সংসদ ভবনে গণমাধ্যম কর্মীরাও ভিড় জমান। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে গেলেও তারা সংসদ ভবনে উপস্থিত হননি। এরপর তারা শপথ নিচ্ছেন না এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।

সূত্র মোতাবেক, শপথ নিতে যেতে বিলম্ব হওয়ার কারণ ছিল দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষা। নির্বাচিত চারজন গুলশানের একটি বাসায় একসঙ্গে অবস্থান করেন। দুপুরের পর দলের হাইকমান্ড থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই তারা সংসদ অভিমুখে রওনা হন। বিকালে তারা শপথ নেন।এই চারজন হলেন- ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আবদুস সাত্তার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের হারুনুর রশীদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের আমিনুল ইসলাম এবং বগুড়া-৪ আসনের মোশাররফ হোসেন।

বিএনপি শুরু থেকে বলে আসছিল শপথ নিলে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। এই হুমকিও যখন কাজ করছিল না তখন বিএনপির হাইকমান্ড ভেবে দেখল দলকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চার এমপি যদি শপথ নিয়েই নেন তবে বিএনপির দলীয় শৃংখলা (চেইন ইন কমান্ড) নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। দলের ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।এমতাবস্থায় শপথের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি।

শপথ নেয়ার ব্যাখ্যায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত দুদিন ধরে বলে আসছেন যে, এই সিদ্ধান্ত তাদের রাজনৈতিক কৌশলের একটি অংশ। যদিও এই কৌশল তিনি পরিস্কার করেন নি।তবে ধারণা করা হচ্ছে- শপথ নেয়ার বিষয়ে ওই চার সংসদ সদস্য বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও বিভিন্ন সরকারি বাহিনীর চাপে ছিলেন।তাদের কাউকে কাউকে গুমের হুমকিও দেয়া হয়েছিল। ওই চার নেতা হুমকির বিষয়টি বারবার দলের হাইকমান্ডকে বলে আসছিল। বিষয়টি মাথায় রেখে তারেক রহমান শপথের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেন।

এছাড়া সংসদের বিএনপির দাবিগুলোর পক্ষে কথা বলার সুযোগটুকু হাতছাড়া করতে চাচ্ছে না দলটির নীতি নির্ধারকরা। এ কারণে ইউটার্ন নিয়েছে বিএনপি।সংসদে যোগ দিয়েই বিএনপির এমপি হারুনুর রশীদ খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করেন। জানা গেছে, বিএনপির ৫ সংসদ সদস্যের শপথের পেছনে বিএনপির চেয়ারপারসনের মুক্তির বিষয়টি জড়িত। পর্দার অন্তরালে এ ধরণের একটি আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। যদিও বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা বিষয়টি অস্বীকার করে আসছেন।

বিএনপি নেতারা সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বিদেশি বন্ধুদের কথাও বিবেচনায় নেয়। ধারণা করা হচ্ছে বহির্বিশ্ব জনরায় মেনে নিতে এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলন ত্বরান্বিত করতে বিএনপিকে পরামর্শ দিয়েছে। সেটিও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির মোট ছয়জন জয়ী হন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন আরও দু’জন। নির্বাচনের পরপরই ভোটে ব্যাপক অনিয়ম এবং কারচুপির অভিযোগ তুলে তা প্রত্যাখ্যান করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

পুনর্নির্বাচনের দাবি জানানোর পাশাপাশি তারা শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও এ সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে গণফোরামের দুই সংসদ সদস্যের মধ্যে মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহম্মেদ গত ৭ মার্চ শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেন।

তাকে অনুসরণ করে গণফোরামের প্রতীক উদীয়মান সূর্য নিয়ে সিলেট-২ আসন থেকে নির্বাচিত দলটির আরেক নেতা মোকাব্বির খান গত ২ এপ্রিল শপথ নেন। গত ২৫ এপ্রিল বৃহস্পতিবার শপথ নেন ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির মো. জাহিদুর রহমান। শপথ গ্রহণের সময়সীমার শেষ দিনে এসে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া বিএনপির বাকি চারজনও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

পাঠকের মতামত