প্রেক্ষাপটে শ্রমিক দিবস : কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বৈষম্য!

আজপহেলা মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। আজকের দিনটি খেটে খাওয়া শ্রমিকদের উৎসবের দিন। আজকের দিনটি তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন। ১২৯ বছর আগে শ্রমিকের রক্তে অর্জিত অধিকারের জন্য আজও সংগ্রাম করে চলেছে শ্রমিকরা। আজও তারা ৮ ঘণ্টার কাজের অধিকার থেকে বঞ্চিত।

তৎকালীন মার্কিন সরকার এবং মালিক পক্ষ স্বভাবতই শ্রমিকদের এই আন্দোলনকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল। পুলিশ এবং মালিকদের পেটোয়া বাহিনী নিরস্ত্র শ্রমিকদের ওপর নৃশংস আক্রমণ চালিয়েছিল, রক্ত ঝরিয়েছিল। হে মার্কেটের শ্রমিকদের রক্তরাঙা পতাকা হাতে নিয়ে ১২৯ বছর ধরে দুনিয়াব্যাপী শ্রমিকরা শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই-সংগ্রামের নতুন নতুন অধ্যায় রচনা করে চলেছে।

বাংলাদেশেও এই দিবসের যথেষ্ট মর্যাদা রয়েছে। এবারের মে দিবসের প্রতপাদ্য হচ্ছে ‘ শ্রমিক-মালিক ভাই ভাই সোনার বাংলা গড়তে চাই’। কিন্তু আজও বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা মজুরি বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। বর্তমান সময়ে নারীরা সামাজিক ও ধর্মীয় অনেক বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে বেঁচে থাকার তাগিদে কর্মক্ষেত্রে পুরুষদের সাথে সমানতালে কাজ করছে। জাতীয় উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শ্রমজীবী-কর্মজীবী নারীদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

Untitled

ছবি: এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে ৮৫ ভাগ নারী শ্রমিক যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

কিন্তু সেদিক থেকে দেশে নারীদের কর্ম পরিবেশ নেই বললেই চলে। কাজ করতে গেলে নানা বৈষম্য, নির্যাতন ও হয়রানীর শিকার হতে হচ্ছে নারীদের। এখনো কোন কোন কর্মক্ষেত্র নারীদের জন্য অনিরাপদ। তার উপর বেতন বৈষম্যতো আছেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় নারীরা নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য বেতন, শ্রমিক অধিকার খুবই কম পাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৬-১৭ শ্রম জরিপে দেখা যায়, দেশে ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মে নিয়োজিত রয়েছেন ৫ কোটি ১৭ লাখ ৩৪ হাজার মানুষ। এর মধ্যে নারী শ্রমিক রয়েছেন ১ কোটি ৭১ লাখ ২১ হাজার আর পুরুষ রয়েছেন ৩ কোটি ৪৬ লাখ ১৩ হাজার। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির মধ্যে ব্যবস্থাপক পর্যায়ে কর্মরত রয়েছেন ৬ লাখ ৬১ হাজার মানুষ। তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ৬৪ হাজার এবং পুরুষ ৫ লাখ ৯৭ হাজার। পেশাদার রয়েছেন ১৯ লাখ ৪০ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ সাড়ে ১২ লাখ এবং মহিলা ৬ লাখ ৯০ হাজার। প্রযুক্তি এবং তৎসংশ্লিষ্ট কর্মে রয়েছেন ৭ লাখ ২৭ হাজার, এর মধ্যে পুরুষ ৬ লাখ ২১ হাজার এবং মহিলা ১ লাখ ৭ হাজার।

আরও পড়ুন >>> আইএস কি? কে বা কারা তৈরী করল এদের?

করনিক সহায়ক কর্মে নিয়োজিত আছে ৫ লাখ ৩৭ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ ৪ লাখ ৩৬ হাজার এবং মহিলা ১ লাখ ১ হাজার। সেবা এবং বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করছেন ৬১ লাখ ২৭ হাজার, এর মধ্যে পুরুষ ৫৪ লাখ ২৭ হাজার এবং মহিলা ৭ লাখ। দক্ষ কৃষি-বনায়ন ও মৎস্য খাতে নিয়োজিত রয়েছেন ১ কোটি ৮৬ লাখ ৫০ হাজার, এর মধ্যে পুরুষ ৯৩ লাখ ৫০ হাজার এবং মহিলা ৯৩ লাখ।

কারুশিল্প এবং এ সংশ্লিষ্ট কর্মে নিয়োজিত আছে ৯১ লাখ ৫৯ হাজার, এর মধ্যে পুরুষ ৬১ লাখ ৬৬ হাজার এবং মহিলা ২৯ লাখ ৯৪ হাজার। উৎপাদক-যন্ত্র পরিচালনাকারী এবং সংযুক্তকরণ কাজে নিয়োজিত আছে ৩৮ লাখ ৩১ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ ৩৪ লাখ ৫২ হাজার এবং মহিলা ৩ লাখ ৭৯ হাজার। প্রাথমিক পেশায় যুক্ত ১ কোটি ৮১ হাজার, এর মধ্যে পুরুষ ৭২ লাখ ৯৮ হাজার এবং মহিলা ২৭ লাখ ৮৪ হাজার। এছাড়া অন্যান্য পোশায় যুক্ত রয়েছে ২১ হাজার মানুষ, এর মধ্যে পুরুষ ১৭ হাজার এবং বাকিরা মহিলা।

আরও পড়ুন>>> সফলতা খাবার টেবিলে সাজিয়ে রাখা কোন ভাত-তরকারি নয়

যদি সাধারণ ইটভাটার কথা চিন্তা করি তাহলে সেখানে নারী শ্রমিকদের মজুরি পুরুষ শ্রমিকের থেকে দ্বিগুণ কম। ইটভাটায় একজন পুরুষ শ্রমিক যেখানে সারাদিন কাজ করে ৪০০ টাকা পান। সেখানে একজন নারী একই সময় পর্যন্ত কাজ করে পান ২০০ টাকা। কমেলা বেগম নামের এক ইটভাঙার নারী শ্রমিকের সাথে কথা বলে জানা যায়, সারাদিন কাজ করে তিনি ২৩০ টাকা মজুরি পান। কিন্তু একই সময় পর্যন্ত একই কাজ করে পুরুষ শ্রমিকেরা মজুরি পান ৮০০ টাকা।

Untitled

ছবি: সারাদিন ইট ভেঙে একজন পুরুষ পায় ৮০০ টাকা। অপরদিকে একই কাজ একই সময় পর্যন্ত করে একজন নারী শ্রমিক পায় ৪০০ টাকা।

এমন চিত্র শুধু এক কর্মক্ষেত্রেই নয়, দেশের প্রায় অনেক কর্মক্ষেত্রগুলোতে এই বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন নারীরা। গ্রামের একই ক্ষেতে কাজ করে একজন পুরুষ শ্রমিক পান ৫০০ টাকা, অন্যদিকে একজন নারী শ্রমিক পান ২৫০ টাকা। বাংলাদেশে সবথেকে বেশী নারী শ্রমিক কাজ করেন গার্মেন্টস সেক্টরে। আর সেখানেই সর্বক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন নারী শ্রমিকরা। দেশের অর্থনীতিতে পোশাক শিল্প রাখছে বিশেষ অবদান। এই শিল্পের মালিকদের বিত্তবৈভব ক্রমাগত বাড়লেও শ্রমিকদের কিন্তু মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে।

Untitled

ছবি: গার্মেন্টস সেক্টরে নারী শ্রমিকরা কাজ করছে বিভিন্ন ঝুঁকি নিয়ে, পাচ্ছে না সেবা আর বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

গার্মেন্টস সেক্টরে ৮ ঘন্টা কর্মসময় থাকলেও কাজ করতে হচ্ছে ১২-১৪ ঘন্টা। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ের কোন মজুরি পাচ্ছেন না তারা। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না। অধিকাংশ কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার না থাকায় পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকরা যখন তখন ছাঁটাইয়ের শিকার হয়। সমান কাজে সমান মজুরি পায় না বেশির ভাগ নারী শ্রমিক। গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে কর্মরত শ্রমিকদের ৮০ শতাংশ হলো নারী। এখনও এরকম অনেক গার্মেন্টস আছে যেখানে তাদের যথাযথ নিয়োগপত্র, কাজের নিশ্চয়তা, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ভাতা, নিয়মিত মজুরি, এমনকি কোনো ক্ষেত্রে প্রভিডেন্ট ফান্ডও নেই।

Untitled

ছবি: আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (আইওএম) একটি স্টাডি রিপোর্টে দেখা গেছে, প্রতি ৩ জনে ২ জন অভিবাসী নারী শ্রমিক তাদের নিয়োগকর্তা দ্বারা কোনো না কোনো প্রকার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

বিদেশের কর্মক্ষেত্রেও একই অবস্থা দেখা যায়, বাঙালি নারী শ্রমিকরা দেশের বাহিরে গিয়ে কাজ করতে গিয়ে নানা প্রতারণা ও বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। শারীরিক অত্যাচার, নীপিড়নের মধ্যে থাকতে হচ্ছে তাদের। এমন অবস্থা সহ্য করতে না পেরে অনেকেই বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে দেশে।

কিন্তু এসব বিষয় থেকে উত্তরণের উপায় অবশ্যই আছে। এর থেকে উত্তরণের জন্য বিশেজ্ঞরা নিম্নোক্ত পদক্ষেপের উপর বিশেষ জোর দিয়েছেন-

  • প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক সব খাতের নারী শ্রমিকদেরই চাকরির নিশ্চয়তা এবং ন্যূনতম মজুরির ব্যবস্থা করতে হবে। চাকরিতে যোগদানের সময়ই নিয়োগপত্র দিতে হবে এবং নিয়োগের শর্ত ও মেয়াদ উলে¬খ করতে হবে।

  • সব ক্ষেত্রেই কর্মরত নারীদের কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করতে হবে। ৮ ঘণ্টা কাজ, যথাযথ বিশ্রামের সময় এবং সাপ্তাহিক ছুটির ব্যবস্থা থাকতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে অতিরিক্ত সময় কাজ করাতে হলে ওভারটাইমের ব্যবস্থা করতে হবে। রাত্রিকালীন কাজে নারীদের যথাযথ নিরাপত্তা দিতে হবে। লাগাতার প্রতিদিন ১২ – ১৪ ঘন্টা ডিউটি করানো যাবে না।

  • কাজের ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের সময় তাদের বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজন পূরণের বিষয়টি সহ,ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিতদের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

  • নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য পৃথক শৌচাগারের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কর্মক্ষেত্রে জরুরি ও প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে। কর্মজীবী নারীদের কর্মস্থলে নিরাপদ যাতায়াত বা পরিবহন ব্যবস্থা করতে হবে। যেখানে বেশি সংখ্যক নারীশ্রমিক কাজ করে সেখানে তাদের আবাসিক নিরাপদ বাসস্থান এবং শিশু স্বাস্থ্য পরিচর্যার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

  • অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।

  • সংবিধানে বর্ণিত অধিকার অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে সব ধরনের কাজে সম মজুরির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়োগ, পদোন্নতি, দায়িত্ব ও কাজ বণ্টনে বৈষম্য করা চলবে না।

  • কর্মক্ষেত্রে নারীদের কোনো ধরনের অশালীন ও যৌন হয়রানির শিকার হতে না হয় তার জন্য পর্যাপ্ত প্রতিরোধমূলক আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নারী কর্মীদের প্রতি বখাটেদের উৎপাত বন্ধ এবং রাত্রিকালীন কাজ শেষে ঘরে ফেরার পথে নিরাপত্তার জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

  • নারী শ্রমিকদের সব ক্ষেত্রেই ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দিতে হবে। তাদের যৌথ দরকষাকষির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

  • দেশে সর্বক্ষেত্রে কর্মরত নারীদের শ্রম আইনের আওতাভুক্ত করে তাদের জন্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ২৩নং ধারায় উল্লেখ আছে, কোনরূপ বৈষম্য ছাড়া সব কাজের জন্য সমান বেতন পাওয়ার অধিকার প্রত্যেকের আছে। এই অধিকার অর্জনে শ্রমজীবী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি সোচ্চার হতে হবে প্রতিটি সচেতন নাগরিককে।

#শুভ আহম্মেদ, বিডি৩৬০নিউজ।

পাঠকের মতামত