রমজানে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল এবং নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির জন্য ক্যাব’র ১০টি পরামর্শ

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) একটি অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৮ সালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ভোক্তা অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে কাজ করে আসছে। কয়েকদিনের মধ্যে রোজা শুরু হবে। এ প্রেক্ষাপটে ভোক্তা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয়কে সামনে রেখে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে এ প্রতিষ্ঠানটি।

মঙ্গলবার সকাল ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি হলে এই সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন ক্যাব’র সভাপতি জনাব গোলাম রহমান, সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া, ভোক্তা অভিযোগ নিষ্পত্তি জাতীয় কমিটির আহবায়ক স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন, জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ডঃ এম শামসুল আলমসহ আরো অনেকে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন – ভোক্তাদের প্রত্যাশা সারা বছর মানসম্মত দ্রব্য ও সেবার মূল্য তাদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকবে, স্থিতিশীল থাকবে। কিন্তু এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী পণ্য-সামগ্রীর এবং সেবার মূল্য বৃদ্ধি করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে থাকেন। সরকার এ বিষয়ে নানাভাবে সক্রিয় বলে এখন কৌশল করে রোজার কয়েক মাস আগে থেকেই নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে।

তারা আরো বলেন – বাজারে সেই প্রবণতা দৃশ্যমান। যদিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে আসন্ন রমজানে তেল ছোলা চিনি সহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যাতে না বাড়ে সেজন্য ব্যবসায়ীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ যেন থাকে সে বিষয়টির প্রতি নজর দিতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বাণিজ্যমন্ত্রীও ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ অব্যাহত রাখা ও দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে একই রকম নির্দেশনা দিয়েছেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের হুজুর উৎপাদন ও আমদানি সন্তোষজনক পর্যায়ে আছে কিন্তু ইতিমধ্যে রোজা শুরুর ১২ মাস পূর্বেই বেশ কিছু পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে গরুর মাংসের দাম সহ মাছ, পেঁয়া্‌ রসুন ও চিনির দাম বেড়েছে।

ঢাকায় কয়েকটি বাজার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত কিছুদিনের ব্যবধানে গরুর মাংস প্রতি কেজি ৫০ টাকা চিনি কেজিতে ৮ টাকায় পেঁয়াজ প্রতি কেজিতে ১৫ টাকা আমদানিকৃত রসুন কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে বেশির ভাগ সবজির দাম প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৮০ টাকা মাছের দাম যথেষ্ট বেড়েছে বিশেষ করে পরিবহন খরচ এবং যানবাহনে অনিয়ন্ত্রিত খরচ বাড়ার অজুহাতে বাজার এর সকল প্রকার মাছের দাম বেড়েছে সামনে রেখে এই দাম বৃদ্ধির প্রবণতা আরো বাড়তে পারে বলে আমরা মনে করা হচ্ছে।

পণ্য ও সেবার মূল্য স্থিতিশীল এবং নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির জন্য সংগঠন টির নেতৃবৃন্দ কিছু সুনির্দিষ্ট পরামর্শ প্রদান করেন সেগুলো হলো:

  • প্রতিযোগিতা হ্রাস এবং আইনি নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বাজার বিভাজন এর মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট মুনাফা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে সময় ও সুযোগে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করে আসছে। এই প্রবণতা রোধে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনবোধে বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় অবিলম্বে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। তবে কোন সৎ ব্যবসায়ী যাতে হয়রানির শিকার না হয় তা বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে।

  • এই রমজানে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে রোজা শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে থেকে বাড়তি চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে টিসিবি’র পণ্য বাজারজাতকরণ কার্যক্রম শুরু এবং সারা রমজান ব্যাপী তা অব্যাহত রাখা যেতে পারে।

  • রমজান মাসে উদ্যোগী হয়ে বহুতল ভবনে একসাথে বহু পরিবার বসবাসকারী গৃহিনীরা যদি বহুতল ভবনে ‘ক্রেতা সমবায়’ গড়ে তোলেন এবং পাইকারি বাজার থেকে তাদের সকলের সমষ্টিগত চাহিদা অনুযায়ী পণ্য কিনে ভাগাভাগি করে নেন, তবে তাদের পক্ষে মোট ব্যয় এর ২৫% থেকে ৩০% ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি।

  • রমজান মাসে ভোক্তা প্রান্তে যেসব পণ্যের অতিরিক্ত ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা অন্যায়ভাবে দাম বাড়িয়ে বাড়তি মুনাফা করার চেষ্টা করে সেই সব পণ্যের বৈচিত্রমুখী ব্যবহারের চেষ্টা বা খাদ্যাভ্যাসে কিছুটা পরিবর্তন এনেও ভোক্তারা অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন।

  • রোজার সময় পণ্য বা সেবার দামই শুধু বাড়ে না অসাধু ব্যবসায়ীদের দ্বারা ভোক্তারা নানা ভাবে প্রতারিতও হন। এই রমজান মাসে ভোক্তা অধিকার আইনের আওতায় ভোক্তা অভিযোগ কেন্দ্র বা কল সেন্টারে (কল সেন্টার এর ফোন নম্বর 019 77 00 80 71 0 1 9 7 700 80 72) ফোন করে আপনাদের অভিযোগ জানানোর আহবান করছি। ভোক্তারা প্রতারিত হলে বা তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হলে যত বেশি অভিযোগ আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারব, অসাধু বিক্রেতাদের উপর তত বেশি আইনি ও নৈতিক চাপ তৈরি করতে পারব।

  • ভোক্তাদের সচেতনতার সাথে সাথে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সমূহ বিশেষ করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, র‍্যাব, পুলিশ, বিএসটিআই, সিটি কর্পোরেশন ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম জোরদার করার অনুরোধ করছি।

  • মোবাইল কোর্ট সমূহ বিশেষ অভিযান পরিচালনা করবেন এই প্রত্যাশা করছি।

  • ভোক্তা সাধারণ মুক্তবাজার অর্থনীতির সুফল ভোগ করতে চায়। আর তা কেবল সম্ভব যখন বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা থাকবে। মানসম্মত পণ্য ও সেবার পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত হবে। গুটিকতক ব্যবসায়ীর দ্বারা বাজার নিয়ন্ত্রণ কখনো ভোক্তা স্বার্থের অনুকূল হতে পারে না। সরকারকে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আরো প্রো-একটিভ হতে হবে।

  • পবিত্র রমজান মাসে সারাদেশে বিদ্যুৎ গ্যাস ও নিরাপদ পানির নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

  • সড়কে যানবাহন স্বাভাবিক চলাচল ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি, যাতায়াতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ, সড়কে চাঁদাবাজি প্রতিরোধ, রেলের টিকিট বিক্রির কালোবাজারি বন্ধ, মার্কেটগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ, মলম পার্টির দৌরাত্ম্য রোধ ও নোট জালকারী চক্রের তৎপরতা বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে মনে করেন অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’র নেতারা।

সংবাদ সম্মেলন শেষে উপস্থিত সাংবাদিক সহ সকলের সহযোগিতা কামনা করে অনুষ্ঠান সমাপ্তি ঘোষণা করেন ক্যাব’র সভাপতি গোলাম রহমান।

#ওয়াসিম এমদাদ, স্টাফ রিপোর্টার।

পাঠকের মতামত