একশো দিনে চারশো! দেশটা ধর্ষকদের নয় মানুষের

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের হার গত কয়েকমাসে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রবণতা এতটাই বেড়েছে যে মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের এই জগৎ থেকে সভ্য শব্দটি উঠে গেছে। গত ১০০ দিনে প্রায় চারশ’ নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। তবে সংখ্যার বিচারে অনেক ঘটনা আমাদের সামনেই আসে না। সেসব বাদ দিয়েও এই সংখ্যা আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের চুড়ান্ত পর্যায় নির্দেশ করে। কোন ভাবেই যেন ধর্ষণকারীদের থামানো যাচ্ছে না। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও একাধিক ধর্ষণের খবর আসছে। এর ভেতর গণধর্ষণের ঘটনাই বেশি ঘটছে। ধর্ষণকারীদের আইনের আওতায় আনা হলেও এ ঘটনা চলছেই।

পত্রিকার পাতায় পাতায় নারী ও শিশু নির্যাতনের খবর পড়তে হয়। কোন রাজনৈতিক দলের লেবাস গায়ে জড়িয়ে এরা এসব অপকর্ম আড়াল করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কথায় বলে চোরের সাতদিন আর সাধুর একদিন। প্রকৃতপক্ষে সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেয় না কোন দল। বরং কোন কোন ব্যাক্তিই দলের নাম ভাঙিয়ে ক্ষমতার সিড়িতে উঠতে চেষ্টা করে। তাই যে কোন দলের উচিত এই ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড যারা করে তাদের দলের বাইরে ছুড়ে ফেলা। কোন ঘটান ঘটার পরে নয় ঘটনা ঘটার আগেই তাদের দল থেকে বের করে দিতে হবে। তাতেই দলের মঙ্গল দেশের মঙ্গল।

সাধারণ মানুষও স্বস্তিতে থাকে। আর যতদিন এসব নোংরা থাকে ততদিন ভালোর সুবাতাস বইতে পারে না। কি হচ্ছে এসব? কেন হচ্ছে? উন্নত হলে কেবল বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকেই উন্নত হলে চলে না। উন্নত হতে হয় মানসিকতায়। আমরা কি দিন দিন মানসিকভাবে পিছিয়ে যাচ্ছি। যারা এসব কর্মকান্ড ঘটছে তারা অনেক সময় নিজের প্রবৃত্তি চরিত্রার্থ করতে কোন রাজনৈতিক দলের লেবাস ব্যবহার করছে। আদতে এসব মানুষ দলের জন্য বোঝা। এদের জন্যই দল সমালোচিত হয়। তাই সমাজ বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত যে কাউকে কোন দলেরই কোনভাবে সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।

এখন সময়ের দাবি হলো এসব ধর্ষণকারীদের শাস্তি অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করা এবং তা কঠিন হতে হবে। যাতে সমাজের বাকি কু প্রবৃত্তির মানুষের অন্তর কেঁপে ওঠে। সাত মাস থেকে সত্তুর বছর। ধর্ষিতা হয়ে চলেছে কত নারী। কেউ কারও বোন কারও স্ত্রী কারও বা আত্মীয়। হামাগুড়ি দিয়ে যেন সাপের মত ফণা তুলে প্রতিদিন ধর্ষকরা ঘুরে বেড়ায়। ওৎ পেতে থাকে অন্ধকারে। তারপর নৃশংস থেকে নৃশংসতম হয়ে ওঠে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেই চলেছে। এটা একটা ভাইরাসের মত ছড়িয়ে চলেছে। শুধু প্রতিষেধকটা জানা নেই।

একজন দুইজন করে প্রতিদিন সংখ্যা যেন বেড়েই চলেছে। ধর্ষণ মানে তো শারিরীক মৃত্যু নয়। তবে তা মানসিক মৃত্যু। বেঁচে থেকেও সে মরে থাকে। আবার ধর্ষণের পর মুখ বন্ধ করতে মেরেও ফেলছে। নৃশংস থেকে নৃশংসতম ঘটনা আমরা দেখে চলেছি। সভ্য সমাজে অসভ্য বর্বদের পদচারণায় ক্রমেই ধরণী ভারী হয়ে উঠছে। এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার যেন কোন উপায় নেই। পশুবৃত্তি যেন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে চেপে বসেছে যেন
সেখান থেকে আলোর পথ দেখিয়ে মনুষ্যত্ব পথ দেখানোর কেউ নেই। সমাজে ধর্ষণকারীদের দাপটই বেড়ে চলেছে।

পাকিস্থানীরাও একসময় এদেশের লাখ লাখ মা বোনের ইজ্জত নিয়েছিল। তোরা নাকি নারীদেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেটেও নিত। বেয়নেট দিয়ে খচুচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাত্ত করতো তাদের যৌনাঙ্গ। কিন্তু তারা তো পাকিস্থানী ছিল। ইতিহাসে ওদের বর্বর বলেই স্বাক্ষি দেয়। কিন্তু আজ যা হচ্ছে তা করছে কারা। এদেশেও আজ ধর্ষণের পর মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হয়। এটা আমাদের কাম্য বাংলাদেশ নয়। এসব বিকৃত মনের মানুষ সোনার বাংলা গড়ার অন্তরায়। নিজ দেশের চেনা মুখগুলোর কাছে প্রতিনিয়ত ধর্ষিত হতে হবে স্বাধীন দেশের কেউ তা ভেবেছিল। ভাবেনি মনে হয়।

আর ভাবেনি বলেই কবি শামসুর রহমান তার কবিতায় লিখেছেন স্বাধীনতা তুমি গ্রাম্য মেয়ের অবাধে সাতার। যেখানে সমাজের আনাচে কানাচে ধর্ষণকারী ঘুরে বেড়ায় সেখানে অবাধে সাতারের প্রশ্নই আসে না। আমাদের মেয়েরা তো বন্দি। অনেক ক্ষেত্রেই আজকাল আবার পরোক্ষভাবে ধর্ষিতার দিকেই অভিযোগের আঙুল তোলা হয়। আসলে সাপ যাকে কোনদিন দংশন করেনি সে কি পারে বিষের যন্ত্রণা অনুভব করতে। যে পরিবারের একটা মেয়ে ধর্ষণে শিকার হয় সেই পরিবারই যন্ত্রণা বোঝে। কারণ সমাজটা বড় অদ্ভূত। ধর্ষিতাকেই নানা কটু কথা শুনতে হয়। আবার ধর্ষকদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার লোকেরও অভাব হয় না। মেয়েটার কত দোষ চোখে আঙুল দিয়ে বের করে দেয়।

এই সাফাই গাওয়ার প্রবণতা ধর্ষকদেও উৎসাহ দেওয়ারই নামান্তর। কিন্তু আমরা তো একটা ধর্ষণকারী মুক্ত সমাজ চাই। ধর্ষণ তো কামের কৃ প্রবৃত্তির চুরান্ত রূপ। কামের বশবর্তী হয়ে ওরা যে সমাজটাকেই ধর্ষণ করে চলেছে তার খবর ওরা রাখে না। সভ্য সমাজে অসভ্য হায়েনার নাচ আর কতকাল দেখতে হবে কে জানে। অবশ্য সভ্যতার দোহাই দিয়ে আজকাল আমরা যা করছি তাতে আর নিজেদের সভ্য বলা যায় কি না ভেবে দেখতে হবে। পোশাকে আশাকে রুচিশিল হলেই তাকে সভ্য বলা যায় না। অথবা গাড়ী ঘোড়া চড়ে সুটেড বুটেড হয়ে রাস্তায় বেরুলেই সভ্য সমাজের অংশ হওয়া যায় না। সভ্যতা তো থাকে প্রথম অন্তরে তারপর তার বাহ্যিক প্রকাশ ঘটে।

এ নিয়ম সব সমাজের সব দেশের। আমরা পোশাকে আশাকে যতটা সভ্য হয়েছি আচরণে কি ততটাই অসভ্যতা প্রমাণ করছি না। সভ্যতা অসভ্যতা নিয়ে কথা বলে কি লাভ। আমরা কেবল পোশাকেই সভত্যাকে আনতে পেরেছি। মনে তো সেই আদিমতা। যারা ধর্ষক তাদেরও কি বোন নেই। তারাও কি তার ভাইয়ের মত অন্য কাউকে ভয় পায়। সে কি আদৌ জানে তার পরিচিত মুখ কতটা ভয়ংকর। পোশাকে নয়, সভ্যতা হয় মনে। মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া সভ্যতার উৎকর্ষ সাধন অসম্ভব। মেয়েদের ভোগের বস্তুর দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করার আগে একবার নিজের পরিবারের দিকে তাকাই। আজ যারা ধর্ষণ করছে তাদের পরিবারের মেয়েদের লজ্জা অনেক বেশি। তারা তো জানেই না তার আশেপাশেই এরকম একজন ধর্ষণকারী ঘুরে বেরাচ্ছে। তাই সবার আগে নিজের মনকে সভ্যতার মাপকাঠিতে বিচার করতে হবে। অপরাধ অপরাধই। কোন অপরাধ ছোট নয়।

কারণ অপরাধকে ছোট করে দেখলেই তা একসময় মহীরুহ আকার ধারণ করে। কোন ধর্ষণকারী যেন আইনের আওতা থেকে কোনভাবেই বের না হতে পারে। ধর্ষণকারীদের কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করতেই হবে। ধর্ষণকারী কোন সমাজের কোন দলের বা কোন গোষ্ঠীর হোক না কেন সেখান থেকে তাকে টেনে নামাতে হবে। কোন মতেই তাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। পরিশেষে বলি, কয়েকদিন আগে দেখলাম ভারতের একটি শহরে একটি গাভীকে ধর্ষণের অভিযোগে পুলিশ যুবককে গ্রেফতার করেছে। আমাদের এই অধঃপতন কেন? কিভাবে রোধ হবে এটি?

কিভাবে এই অধঃপতন রোধ করা যাবে তা সময়ের হাতে ছেড়ে দেয়া ছাড়া আপাতত আমাদের কিছুই করার নেই। তবে একথা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি এদেশটা কোন ধর্ষকদের নয়, মানুষের। যারা একদিন না একদিন এসব অন্যায়ের শেষ করবেই।

#অলোক আচার্য, পাবনা প্রতিনিধি।

Agami Soft. - Inventory Management System

পাঠকের মতামত