নুসরাতের মৃত্যু ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের নিরাপত্তা

অবশেষে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে নুসরাত জাহান রাফি মারা গেছে। নুসরাত শেষ পর্যন্ত লড়াই করে গেছে। তার বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং মৃত্যুর বিরুদ্ধে। চিকিৎসকরা প্রাণপন তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল কিন্তু সম্ভব হয়নি। নুসরাতের মৃত্যুর মধ্যে দিয়েই এদেশে এধরনের ঘটনার পরিসমাপ্তি হবে না। আরও নুসরাত এভাবে মারা যাবে যতদিন না আমাদের নৈতিক অধঃপতন রোধ হয়।

নুসরাতের লেখা একটি চিঠি থেকে বুঝতে পারি নুসরাত লড়াই করতে চেয়েছিল তার হয়রানির বিরুদ্ধে। তার মাদ্রাসার অধ্যক্ষ তাকে বিভিন্ন সময় যৌন হয়রানি করতো। অধ্যক্ষসহ অভিযুক্তদের বিচার প্রক্রিয়াধীন। বিচারও হবে। কিন্তু নুসরাতের মতো আরও অনেক মেয়ে এদেশে বিভিন্ন সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন হয়রানির শিকার হয় এমনকি ধর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটছে। মা বাবা এবং আত্মিয়-স্বজনের পরে অভিভাবকের কাছে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ছিল শিক্ষক।

তবে এখন সেই ধারণা পাল্টে গেছে। এখন মেয়েরা বুঝে গেছে তারা কোথাও নিরাপদ নয়। যতই নারীর সমান অধিকারের কথা বলা হোক না কেন বিষয়টি অনেক দূর। তারা রাতে যেমন নিরাপদ নয় তেমনি দিনেও নিরাপদ নয়। শিক্ষকদের দেখেই বাকি সবার শেখার কথা। কিন্তু কি শিখছে? আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে অনিরাপদ হয়ে উঠছে। শিক্ষকরা নিজেদের সেই পিতার সমান মনোভাব ধরে রাখতে পারেননি। তাদের কাছে জ্ঞান লাভ করতে আসা তাদের সন্তানসম মেয়েরা তাদের লোভের শিকার হচ্ছে।

নিজের অবস্থান এবং পদ ভুলে কেবল হীন মানসিকতা প্রশ্রয় দিয়ে এসব অপকর্ম করে যাচ্ছে। আর কোনদিন হয়তো আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপদ হবে না। যাদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় কোনভাবেই জানা সম্ভব না ভবিষ্যতে সে কোন নেতিবাচক কর্মকান্ডে জড়াবে কি না। অধ্যক্ষের যৌন হয়রানির শিকার হয়ে প্রতিবাদ করায় তাকে পরীক্ষার হলে গিয়ে আগুন লাগিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনা এর আগে ঘটেনি।

কোন মানুষের রক্ত পরীক্ষা করলে সে নেশাগ্রস্থ কি না তা জানা যায়। কিন্তু এমন কোন পরীক্ষা নেই যে নিয়োগকৃত শিক্ষক মানুষ কি না। এরকম ব্যবস্থা থাকলে বেশ ভালোই হতো। অন্তত কোন নরপশিাচকে শিক্ষকতার মতো পবিত্র কোন পদে নিয়োগ দেয়া হতো না।

আমাদের দেশে হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লাখ লাখ শিক্ষক কর্মরত। প্রাথমিক শ্রেণিতেই কর্মরত রয়েছে কয়েক লাখ শিক্ষক। এরপর মাধ্যমিক,উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও প্রচুর শিক্ষক কর্মর রয়েছে। সত্যি কথা বলতে আমাদের দেশে আজও শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদার আসনে বসানো হয়। আজও শিক্ষক মানে মা বাবার পরেই একটি অবস্থান।

শিক্ষক যত দরিদ্রই হোক না কেন জ্ঞানের দিক থেকে তিনি দরিদ্র নন। এই বিশ্বাসটা আজও আমাদের দেশের মানুষের ভেতর রয়েছে। কিন্তু খুব ধীরে ধীরে সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরতে শুরু করেছে। শিক্ষকদের নৈতিকতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। নানা অনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য পুরো শিক্ষক সমাজ আজ কাঠগড়ায়। একেবারে প্রাথমিক শ্রেণি থেকেই শিক্ষকদের মাধ্যমে মেয়ে শিশুরা শারিরীক নির্যাতনের খবর এমনকি ধর্ষণের খবর পর্যন্ত পত্রিকায় দেখতে পাই। যদিও এই সংখ্যা একেবারে হাতে গোণা।

কিন্তু এই স্বল্প সংখ্যক ঘটনাই মানুষের মনে দাগ ফেলছে। এখন তথ্যের অবাধ প্রবাহের যুগ। ফলে ঘরে বসেই জানতে পারছি দেশের কোন এক প্রান্তে কোন অমানুষ শিক্ষকের নির্যাতনের শিকার হয়ে কোন মেয়ে শিশু হাসপাতালের ভর্তি। অথচ প্রাথমিকের একটি মেয়ে শিশু তার মা বাবার থেকে ভিন্ন কিছু চোখে দেখে না সেই শিক্ষককে।

সেই শিক্ষক যখন তার সাথে নোংরা আচরণ করে তখন কেবল শিক্ষক সমাজের ওপর কলংক লেপনই হয় না বরং সেই ছোট মেয়েটির মনের ওপর এত বিরুপ প্রভাব ফেলে যে ভবিষ্যতেও সে কোন শিক্ষককে বিশ্বাস নাও করতে পারে। অথচ সবাই কিন্তু খারাপ না। মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে হরহামেশাই এসব বিশ্বাস ভঙ্গের ঘটনা ঘটছে। এর খুব কম সংখ্যক ঘটনায় বাইরে প্রকাশিত হয়।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়েরা এধরনের ঘটনা প্রকাশ করে না। এটা মেয়েটি কোন ঘনিষ্ট বান্ধবী জানে আবার নাও জানতে পারে। কিছু সংখ্যক ক্ষেত্রে এ ধরনের শিক্ষকের ঘটনা মা বাবার কাছে মেয়েটি জানায়। তবে মা বাবাও সম্মানের ভয়ে ঘটনাটি চাপা দিয়ে যায়। কারণ আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় দোষের ভাগটা মেয়েদের দিকেই বেশি থাকে। খুব অল্প সংখ্যক মেয়ের ঘটনা প্রকাশিত হয় এবং তা মেয়েটির সাহসিকতায়। নুসরাতের মতো সাহসী মেয়েরা প্রতিবাদ করে এবং আরও নির্যাতনের শিকার হয়। যেমনটা নুসরাতে গায়ে আগুন ধরিয়ে করা হয়েছিল।

এই ঘটনার পর জানা গেলো এই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ইতিপূর্বেও এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছেন। অথচ নুসরাতের ঘটনা সামনে না এলে এই দুশ্চরিত্র অধ্যক্ষের বিষয়ে আমরা জানতেই পারতাম না। তার ঘনিষ্টরা বিষয়টি হয়তো জানে। কারণ অপকর্ম একা একা চালিয়ে যাওয়া যায় না। অনেকে জেনেও মুখ খোলেনা। এখন এই ধরেনর মানুষকে কি আদৌ শিক্ষক বলা যায়। এরা নিজেদের শিক্ষক বলে দাবি করতে পারেন না। যখন একজন শিক্ষক তার অবস্থান থেকে সরে এসে নোংরামি করেন তখন তাকে আর শিক্ষক বলা যায় না। একজন যৌন নির্যাতনকারী, একজন ধর্ষক কখনো শিক্ষক হতে পারেন না। বুঝতে হবে শিক্ষকতাকে সে একটি খোলস হিসেবে নিয়েছে। যার আড়ালে থেকে সে এসব অপকর্ম নির্বিঘ্নে করতে চেয়েছে।

ঠিক ফেনীর সেই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ যেমন করেছে। এখন একজন খারাপ শিক্ষকের জন্য বাকি শিক্ষকদের দোষারপ করা যায় না। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা অভিভাবকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলে। নিজের সন্তানকে নিয়ে এরা চিন্তিত। কারণ বর্তমনা সময়ে দিনের অধিকাংশ সময়েই বাইরে লেখাপড়ার জন্য অবস্থান করতে হয়। সেক্ষেত্রে সে কোন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে থাকে। তার ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব থাকে সেই শিক্ষকের ওপর।

শিক্ষকের দ্বারা যখন একটি শিশু ধর্ষণের মতো চূড়ান্ত নোংরামির শিকার হয় তখন ভরসার জায়গাটুকু আর থাকে না। এই ঘটনার পরে অভিভাবকরা নিশ্চিতভাবে চিন্তিত এবং তাদের উদ্বিগ্নতার যথেষ্ট কারণও আছে। যারা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছে তাদের একথা অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে এই পেশা আর দশটা পেশা থেকে আলাদা। এই পেশার ব্যক্তিত্ব অন্য পেশা থেকে আলাদা হতে হবে। নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে যেন তা সত্যিকারের অভিভাবকের সমতূল্য হয়ে ওঠে। শিক্ষকরা যদি পথভ্রষ্ট হন তাহলে পুরো জাতিই পথভ্রষ্ট হবেন। একজন দুজনের জন্য অবশ্যই পুরো শিক্ষকজাতি দুর্নাম কুড়াবে না। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপদ হোক প্রত্যেক মেয়েশিশুর জন্য। সেইসাথে শিক্ষকরা হয়ে উঠুক প্রকৃত অভিভাবক।

#অলোক আচার্য, পাবনা প্রতিনিধি।

পাঠকের মতামত