‘জন্ম-মৃত্যু, স্রষ্টা-সৃষ্টি, প্রেম-অপ্রেম, শরীর-অশরীর সব একাকার হয়ে যায় এই কবিতায়’

পশ্চিমা সাহিত্যে এলিজাবেথীয় যুগের সহজ সরল কবিতার ধারা ততোদিনে শেষ হয়ে কাব্যাঙ্গণ ঝলমল করছে বুদ্ধিদীপ্ত যুক্তি-বিজ্ঞানের দর্শনে । কবিতায় চ’লে এসেছে আধ্যাত্মবাদ, উৎপ্রেক্ষার চাকচিক্য, উপমার ব্যবহারে জায়গা করে নিয়েছে “Poetic Intelligence” । প্রেমের কবিতায় বিমূর্ত হয়ে উঠেছে নতুন সন্দর্শন, জন্ম-মৃত্যু, অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের প্রশ্নে কবিতায়— আবেগের জায়গায় নেমে এসেছেন গঠনমূলক যুক্তির রসায়ন ।

কালের নামকরণ অনুযায়ী তখন “Jacobean Age”, অর্থাৎ “Elizabethan Pietry”-র ধারাকে টপকে এসে নতুন এই ধারায় লেখা শুরু করলেন জন ডান (John Donne 1572-1631)। এবং তাঁর এই একই ধারা অনুসরণ করলেন Richard Crashaw, George Herbert, Henry Vaughan, এবং Andrew Marvell; এঁদের কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য হলো ‘Wit’ এবং “ Conceit”-এর ব্যবহার।
কবিতায় প্রচলিত আবেগের পরিবর্তে যুক্তি-দর্শনের এমন ব্যবহার দেখে এঁদেরকে কেউ কেউ “দার্শনিক কবিকূল” (Metaphysical Poets) বলা শুরু করলেন, এবং জন ডান হলেন এঁদের গুরু ।

সপ্তদশ শতাব্দীর অন্যতম কবি, সমালোচক “জন ড্রাইডেন”-ই সর্বপ্রথম তাঁর এক সমালোচনায় “জন ডান” সম্পর্কে বললেন,— “Donne affects the metaphysics” ।

কবিতায় মেটাফিজিক্স বা অধিবিদ্যার নামকরণের সম্পর্ক মূলত এখান থেকেই শুরু… ওই সময় থেকেই ডান এবং তাঁর অনুসারীদেরকে (followers) “Metaphysical Poets” বলা হ’তো । এঁদের সম্পর্কে বলত গিয়ে ডা. স্যামুয়েল জনসন উল্লেখ করেছেন—“A race of writers that may be termed the metaphysical poets.” এই সংযুক্তি মূলত ড্রাইডেনকেই সমর্থন করে, এবং এটা থেকেই “মেটাফিজিক্যাল কবি এবং কবিতার ধারণাটি” পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয় ।

কিন্তু মেটাফিজিক্যাল কবিতা সম্পর্কে তৎকালীন বোদ্ধাগণের ধারণা ছিলো যে, এই ধরণের কবিতা মূলত কবিগণ তাঁদের নিজেদের পাণ্ডিত্য জাহির করার জন্যই লিখতেন । এবং ড্রাইডেনকে সমর্থন দিয়ে এই বিশেষ কারণেই কবিতায় মেটাফিজিক্স শব্দটি প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পেলেন ডা. স্যামুয়েল জনসন ।

দর্শনের পরিভাষায় “Metaphysics” শব্দটি গ্রীক শব্দ—Meta এবং Physics এর সমন্বিত রূপ । এখানে meta অর্থ—beyond বা ছাড়িয়ে যাওয়া, আর physics শব্দটি nature (প্রকৃতি) এহকাল বা শরীর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে । অর্থাৎ Metaphysics বলতে এমন কিছুকে বোঝানো হয়, যেটা অস্তিত্ব বা আমাদের চাক্ষুষ প্রকৃতির বাইরে গিয়ে অন্য কিছুর ধারণা দেয় বা দিতে সক্ষম হয় ।
আর মেটাফিজিক্যাল কবিতা এমন এক জিনিস, যা পড়তে গেলে পাঠক হবেন চন্দ্রাহতের মতো; অথবা মতিভ্রমগ্রস্থের মতো,—অনেকটা হিপনোটাইজিং অবস্থা ।

এই ধরণের কবিতার একটি লাইনের পর আরেকটি লাইন, তারপর আরেকটি… কবি যে পাঠককে কোথাত্থেকে কই নিয়ে যাচ্ছেন তা পাঠক নিজেই জানেন না । হঠাৎ করে নিজেকে আবিষ্কার করবেন কোনো এক অনস্তিত্বে… এটা এমন এক ডাইমেনশন, যা ধরা যায় না ছোঁয়া যায় না, তবু যেন কী নির্মল সত্যের মধ্যে আবর্তিত এক অবস্থা ।

মেটাফিজিক্যাল কবিতায় কবির সাথে পাঠকের কোন সম্পর্ক থাকে না, থাকে না নিজস্ব কোনো আবেগের হাহাকার । লেখককে অস্বীকার করে পাঠক— ভুলতে বসে নিজের অস্তিত্ব-অবস্থান; ছোঁয়ার মধ্যেই না-ছোঁয়া, ধরণীর হাতকেও দেখায় অধরা, জন্মেই মহাকালের সত্য স্বীকৃত হয়, থাকে সুন্দরের জন্য বৈধব্যকালীন সময়ের মত অস্পৃশ্য ধেয়ান । জন্ম-মৃত্যু, স্রষ্টা-সৃষ্টি, প্রেম-অপ্রেম, শরীর-অশরীর সব একাকার হয়ে যায় । নেই বর্ণনার ভণিতা, নেই সম্মতির অপেক্ষা; যা বলার কবি নিজেই ব’লে যান কবিতায় ।

এখানে এসে অ্যান্ড্রু মারভেলের “To his Coy Mistress” কবিতার কিছু উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে । কবিতার শুরুতেই তিনি লিখেছেন :

“Had we but world enough and time,
This coyness, lady, were no crime.
We would sit down, and think which way
To walk, and pass our long love’s day.
Thou by the Indian Ganges’ side
Shouldst rubies find; I by the tide
Of Humber would complain. I would
Love you ten years before the flood,”

অর্থাৎ:—

তুমি তো ছিলেই, ছিলাম আমিও ।
কিন্তু আমাদের জন্য ঠিক যে জিনিসটাই দরকার
“জগৎজুড়ে অগাধ সময়”, তাই তো পেলাম না গো ।
ওই যে নধর তুমি—সলাজ পুষ্পবতী,
এসবেও ছিলো না কোনো দোষ—
যদি এমনও সময় পেতাম,
পাশাপাশি বসতাম দু’জনে আয়েশে এলিয়ে;
আহ্লাদে দোলাতাম পা;
ততক্ষণে একটা হিসেব ক’রে নেয়া যেত—
কীভাবে কাটাবো আমাদের প্রেমের এই দীর্ঘতম দিনগুলো ।
কতভাবে ভালোবাসবো আমি তোমায়,
কতরকমে ভালোবাসতে জানি আমি;
সব, এত কিছু ভাবতাম ব’সে ব’সে ।
তুমি তো বুঝি হিন্দুস্থানী গাঙ্গের কুলে
সেঁচে এনে তুলে রাখা বিহারী ঝিনুক-মুক্তোর স্তূপ;
আমি ওদিকে আক্ষেপে ভাসি
দূর কানাডিয়ান নদীর স্রোতে—
হা’রে! তোমারে তো আমি ভালোবাসতে পারতাম
নূহের মহাপ্লাবনেরও আরও দশটা বছর আগে থেকে ।

[আমার নিজের করা কাব্যানুবাদ থেকে নেওয়া]

একটু পরে এসেই উনি আবার বলছেন :
Thine eyes, and on thy forehead gaze;
Two hundred to adore each breast,
But thirty thousand to the rest;
An age at least to every part,
And the last age should show your heart.

শুরুতেই কবি “সময় নেই” বলেছেন মৃত্যুকে ইঙ্গিত করে, আবার সময় থাকলে কী করতেন তাও বলছেন । কোন্ কবে হয়েছিলো নূহের প্লাবন, সেখান থেকে পাঠককে ঘুরিয়ে আনলেন, আবার কীভাবে তাঁর প্রেমিকাকে আদর করবেন তাও বলছেন । কবিতায় বুদ্ধিদীপ্ত এই যে উপমার ব্যবহার, এটাকে বলা হয় “conciet”; আবার একই কবিতায়, শেষে এসে তিনি বলছেন:
But at my back I always hear
Time’s wingèd chariot hurrying near;
And yonder all before us lie
Deserts of vast eternity.
Thy beauty shall no more be found;
Nor, in thy marble vault, shall sound
My echoing song; then worms shall try
That long-preserved virginity,
And your quaint honour turn to dust,
And into ashes all my lust;
The grave’s a fine and private place,
But none, I think, do there embrace.

এই এখানে যে শরীরের মধ্যে অশরীরি ব্যপার । একই কবিতায় কবি তার প্রেমিকার শরীরের উপচার নিয়ে বললেন, আবার ক্ষণপরেই উল্লেখ করছেন মৃত্যুকে; the truth of eternity! এখানেই মেটাফিজিক্যাল কবিতার সার্থকতা । অথবা ডান-এর “Death, be not proud” কবিতায়—

“Thou art slave to fate, chance, kings, and desperate men,
And dost with poison, war, and sickness dwell,
And poppy or charms can make us sleep as well
And better than thy stroke; why swell’st thou then?
One short sleep past, we wake eternally
And death shall be no more; Death, thou shalt die.”
উল্লেখযোগ্য ।

“মেটাফিজিক্যাল কবিতার আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট হ’লো “Wit”-এর ব্যবহার । সপ্তদশ শতাব্দীতে এই wit বলতে বোঝানো হ’তো,— “capacity to recognize similarity in disparity and combine playfulness with seriousness.”

যেমন জন ডান-এর “Good Morrow” কবিতায়: —
“And true plain hearts do in the faces rest;
Where can we find two better hemispheres,
Without sharp north, without declining west?”

এই যে কবিতায় সরসরি বর্ণনা-রীতি বাদ দিয়ে যুক্তিবুদ্ধির ব্যবহার, ডাইমেনশন তৈরীর ক্ষেত্রে কবির নিজস্ব চিন্তা-সিদ্ধান্তের একাত্মতা;— এসবের কারণেই কবিতায় পাঠকের মনযোগ ডাইভার্ট করতে সক্ষম হন মেটাফিজিক্যাল কবিগণ । আর এই বিশেষ গুণের কারণেই জন ডানকে বলা হয় “diverting intellectualist” ।

অর্থাৎ, এক কথায় বলতে পারি যে,—“মেটাফিজিক্যাল কবিতা হ’লো কাব্যে অন্য এক ডাইমেনশনের আয়োজন, যা কেবল বিশেষ এই ধরণের কবিতাতেই সম্ভব ।“

“মেটাফিজিক্যাল কবি এবং কবিতার জন্মসূত্র”
লেখক : আল আমীন
Agami Soft. - Inventory Management System

পাঠকের মতামত