পথশিশুর শিক্ষার অধিকার ও আমাদের দায়িত্ব

বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দেখা মেলে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল, স্বল্পোন্নত বা অনুন্নত দেশগুলোতে এদের দেখা বেশি মেলে। আমাদের দেশেও চারদিকে তাকালেই এ ধরনের শিশুর দেখা পাওয়া যায়। রাস্তা বা ফুটপাত যাদের ঠিকানা।

বড়লোকের আহ্লাদে বড় হয়ে ওঠা শিশুদের পাশাপাশি এরাও বড় হয়। অভাব যাদের জীবনে নিত্যসঙ্গী। খোলা আকাশ যাদের মাথার ওপর ছাদ হয়ে থাকে। জন্মের পরপরই তারা পৃথিবীর এক অন্যরকম চিত্র দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠে। ধনী গরীবের ব্যাবধান তারা জন্মের পরেই দেখতে পায়। এসব ভাগ্যহীন, পরিচয়হীন শিশুদের আমরা কখনো টোকাই, কখনো পথকলি, ছিন্নমূল বা পথশিশু বলে ডাকি।

পথই যাদের আপন, পথই যাদের চুড়ান্ত ঠিকানা। যাদের জন্ম হয় পথে অথবা জন্মের পর ঠাঁই হয় পথে আর জীবন পার হয় পথে এবং শেষও হয় সেই পথেই। এরা পথশিশু। যাদের জন্য সমাজের, রাষ্ট্রের, সুশীল সমাজের আমাদের সবার দায় রয়েছে। এসব পথশিশুরা বঞ্চিত হয় রাষ্ট্র প্রদত্ত মৌলিক অধিকার থেকে। এরা অনেকেই শিক্ষা লাভ করার সুযোগ পায় না, পুষ্টিকর খাদ্য পায় না, পোশাক বা মাথার ‘পরে ছাউনি পায় না।

যদিও রাষ্ট্র থেকে এদের জন্য বিভিন্ন সময় নানারকম পদক্ষেপ নেয়া হয়, তবে তা পর্যাপ্ত নয়। কারণ প্রতিনিয়তই এই ধরণের পথশিশুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। জাতিসংঘ শিশু সনদে বর্ণিত ঘোষণা অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী সকলেই শিশু। সে অনুযায়ী আমাদের দেশের একটি বড় অংশই শিশু।

দারিদ্রতামুক্ত দেশ সব দেশের জন্য কাম্য একটি অবস্থা। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে দারিদ্রতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি এতটা সহজ নয় যে হঠাৎ করে কোন পরিবর্তন সম্ভব। আমাদের সামনে এখনো অনেক বাধা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো শিক্ষা। শিক্ষার হার বাড়ছে। আমরা শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নতি সাধন করেছি। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য এখনও অনেক দূর। শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নতির চরম শিখরে পৌছাতে পারে না। এসব পথশিশুকেও আমাদের শিক্ষার আওতায় আনতে হবে। এই কঠিনতম কাজটি আমাদের করতে হবে।

এসব অধিকার বঞ্চিত শিশুকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান করে তুলতে চাই উপযুক্ত শিক্ষা ও পরিবেশ। সঠিক পরিবেশ আর অত্ম-অবহেলায় যেন তারা শিক্ষার মত মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে যুগোপযুগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে যেসব ভাসমান শিশুদের অবস্থান তাদের জন্য সমন্বিতভাবে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। রাজধানী ঢাকায় পথশিশুর সংখ্যা বেশি। এবং এসব পথশিশুর জীবন ও জীবিকা নির্বাহ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে নানা অপরাধমূলক কাজে ব্যাবহার করছে সুযোগসন্ধানী মানুষ। একটু ভালো থাকার আশায় না বুঝেই সেসব কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে এসব পথশিশুদের অনেকেই। তাদের সামনে তো ভালো থাকার বিকল্পও নেই। এভাবে ছোট ছোট অপরাধ থেকে বড় কোন অপরাধে জড়িয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক।

বিশেষ করে এসব পথশিশুকে বেছে নিচ্ছে মাদক কেনা বেচায়। আমাদের বুঝতে হবে প্রতিটি শিশুই তার মেধাশক্তি নিয়ে জন্ম নেয়। শিশুদের মধ্যেই সুপ্ত থাকে প্রতিভা। তারাই হবে দেশ ও জাতির কান্ডারি। এসব অনেক শিশুর মধ্যেই লুকিয়ে আছে কোন বৈমানিক, বিজ্ঞানী, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক বা চিকিৎসক।

পরিবেশ পরিস্থিতিতে কারো মেধাশক্তি বিকশিত হয়, আর কারো বিকশিত হয় না বা হওয়ার সুযোগ পায় না। এই মেধাশক্তি যদি নেতিবাচক কোন কাজে ব্যাবহার করে তাহলে সেটা সমাজের জন্য ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

তাদের কাজে লাগাতে হলে তাদের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। কেবল দারিদ্রতার কারণেই পথশিশু বাড়ছে না বরং এর পেছনে আরও অনেক কারণ রয়েছে। পরিচয়হীন, ঠিকানাবিহীন শিশুদেরও আশ্রয় হচ্ছে পথে।

বড় হয়ে ওঠার সাথে সাথে এসব শিশু পেটের ক্ষুধা মেটাতে নানারকম পেশার কাজ বেছে নেয়। এসবের মধ্যে রয়েছে হকার, শ্রমিক, রিক্সাচালক, ফুল বিক্রেতা, আবর্জনা সংগ্রাহক, হোটেল শ্রমিক, বুনন কর্মী, কুলি, বিড়ি শ্রমিক, ঝালাই কারখানার শ্রমিক ইত্যাদি বিভিন্ন রকম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যা আমরা আমাদের চারদিকে তাকালেই এর বাস্তবতা টের পাই।

কেবল পেটের ক্ষুধা মেটানোই এদের কাছে মূখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এদের মধ্যে অনেকেই তাই একটু ভালোভাবে বাঁচার আশায় না বুঝেই অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে। আমরা যদি তাদের জন্য ভালোভাবে বাঁচার সুযোগ রাখি, তাদের সবাইকে শিক্ষার আওতায় আনা গেলে তারা নিশ্চয় অপরাধীদের কথায় প্রভাবিত হবে না। সমাজ থেকে অপরাধের মাত্রা অনেকটা কমে আসবে। শিক্ষাই তাদের সঠিক পথ দেখাবে।

প্রতিবছর পথশিশুদের নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, টকশোতে সমবেদনা ঝরে, এদের নিয়ে নানা পরিকল্পানা পদক্ষেপের কথা শোনা যায়। কিন্তু এর বাস্তবায়নের হার কমই। ফলস্বরুপ ছিন্নমূল শিশুরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে। অথচ আর দশটা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা শিশুর মতই এদের রয়েছে পুষ্টিকর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকার।

কিশোর কবি সুকান্ত ভট্রাচার্য শিশুর জন্য একটি নিরাপদ বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা আজও সম্ভব হয়নি। দেশের পথশিশুদের সুরক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি দিবসও পালিত হয় আমাদের দেশে। ক্ষুধার জ্বালায় নিজের অস্তিত্ব বাঁচানোর চেষ্টায় পথে নেমেই এদের পরিচিতি হয় পথশিশু নামে। আমাদের সমাজের অনেকেই তাদের এই অসহায়ত্বের সুযোগও নেই। তাদের নানা কাজে ব্যাবহার করি।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশুদের কল্যাণে ১৯৭৪ সালের ২২ জুন জাতীয় শিশু আইন (চিলড্রেন অ্যাক্ট) জারি করেছিলেন। যার মাধ্যমে শিশুদের নাম ও জাতীয়তার অধিকারের স্বীকৃতি, সব ধরনের অবহেলা, শোষণ, নিষ্ঠুরতা, নির্যাতন, খারাপ কাজে লাগানো ইত্যাদি থেকে নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে নির্মমভাবে ঘাতকদের হাতে বঙ্গবন্ধু নিহত না হলে তিনি শিশুদের জন্য অনেক কিছুই করতে পারতেন, যাতে প্রতিটি শিশু তার অধিকার পায়।

পথশিশুদের জীবন অত্যন্ত কষ্টের ও নির্মম। সমাজের নিষ্ঠুর সত্যের সাথে এরা বাস করে। আরাম আয়েশের ঠিক উল্টো দিকে এদের বসবাস। নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য খাওয়া এবং এরকম স্থানে ঘুমানোর কারণে তারা প্রায়ই নানা রোগে আক্রান্ত থাকে। অথচ চিকিৎসার সুযোগ নেই বললেই চলে।

মেয়ে শিশুরা দালালচক্রের খপ্পরে পরে যৌনকাজে বাধ্য হচ্ছে। ফলে তারা নানা রকম যৌন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। একসময় এরা ভাসমান যৌনকর্মী হিসেবে রোজগারের পথ করে নিচ্ছে। অথচ সমাজে এদেরও একটা সুন্দর জীবনের স্বপ্ন ছিল।

বাংলাদেশে পথশিশু সংখ্যা যাই হোক না কেন তা দেশের প্রকৃত উন্নয়নের অন্তরায়। একটা বিরাট অংশ যদি অযত্ন আর অবহেলা অশিক্ষায় বেড়ে ওঠে, তাহলে দেশের প্রকৃত অগ্রগতি ধীর গতির হবে।

পথশিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা তাই সবার আগে দরকার। পথশিশুর শিক্ষায় অনেক বেসরকারি সংস্থাও কাজ করছে। তবে তা অপর্যাপ্ত। বিভিন্ন কারণে ঢাকা শহর ছাড়াও অন্য বিভাগীয় শহরগুলোতে ভাসমান শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। তবে রাজধানীতে এই সংখ্যা বেশি, কারণ বেঁচে থাকার সুযোগ এখানেই বেশি। এসব পথশিশুদের সমাজের সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক হিসেবে আমদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সবাইকে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে।

#অলোক আচার্য, সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

পাঠকের মতামত