নফল নামাজসমূহের গুরুত্ব ও ফজিলতসহ আদায়ের নিয়মকানুন (প্রথম পর্ব)

রাসূলুল্লাহ (সা.) ফরজ, ওয়াজিব নামাজের পর সুন্নত ও নফল নামাজের প্রতি উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। নবী কারীম (সা.) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা‌আলা বলেন, “আমার বান্দা নফলের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে। একপর্যায়ে সে আমার মাহবুব ও ভালোবাসার পাত্র হয়ে যায়. .. …।” ***সহীহ বুখারী, ২:৯৬৩
বিভিন্ন প্রকারের নফল নামাজের মধ্যে আজ থাকছে ইশরাক, চাশত ও আউয়াবিন নামাজ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা।
ইশরাক
সময় ও রাকাত সংখ্যাঃ
ফজরের নামায পড়ার পর দুনিয়ার কাজকর্ম ও কথাবার্তা থেকে বিরত থেকে সূর্য ওঠা পর্যন্ত স্বীয় নামাযের জায়গায় বসে কুরআন তিলাওয়াত, যিকির-আযকার তাসবীহ-তাহলীল ইত্যাদিতে লিপ্ত থাকতে হবে। অতঃপর সূর্যোদয়ের ১২/১৩ মিনিট(কোন কোন বর্ননায় ২৩ মিনিট) পর সূর্য একটু উপরে উঠলে এবং সূর্যের রং পরিস্কার হয়ে গেলে ইশরাকের ওয়াক্ত শুরু হয় এবং ২ ঘণ্টা অবধি থাকে। অবশ্য যদি কেউ ফজরের নামাযের পর দুনিয়াবী কাজে লিপ্ত হয়ে যায় এবং সূর্য ওঠার পর ইশরাক পড়ে, তাও জায়িয আছে। এতেও ইশরাক আদায় হবে, তবে সওয়াব আগের মতো হবে না। ২ বা ৪ রাক’আত নামাজ পড়া সুন্নাত। শাহ আবদুল আজিজ দেহলভি (রহ.) এর মতে, এশরাকের নামাজ দুই রাকাত।
ফজীলত:
আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ আদায় করে স্বীয় স্থানে বসে থাকে, তার জন্য ফেরেশতারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। তারা এভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা করুন; হে আল্লাহ, তার প্রতি দয়া করুন। আর যে নামাজের অপেক্ষায় থাকে তার জন্যও ফেরেশতারা ক্ষমা প্রার্থনায় রত থাকেন। তারা এভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা করুন; হে আল্লাহ, তার প্রতি দয়া করুন। ***মুসনাদে আহমদ।

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জামাতের সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করে এরপর বসে থেকেই সূর্য না ওঠা পর্যন্ত জিকির-আজকারে নিমগ্ন থাকে, অতঃপর দুই রাকাত নামাজ আদায় করে তার জন্য এক হজ্ব ও এক উমরার সমান ছাওয়াব রয়েছে। ***তিরমিজি : ৫৮৬ ও জামে তিরমিযী ১ : ১৩০।
এছাড়া আরো দুই রাক‘আতসহ মোট চার রাক‘আত পড়লে আল্লাহ তা‘আলা সন্ধ্যা পর্যন্ত তার এদিনের সকল কাজের জিম্মাদার হয়ে যান বলে অপর হাদীসে উল্লেখ আছে। ***জামি‌ তিরমিযী, ১ : ১০৮

আলী (রা.) এর বর্ণিত অপর এক হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ফজরের সালাত আদায় করল এবং বসে বসে সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহর জিকির করল, অতঃপর দুই রাকাত বা চার রাকাত নামাজ আদায় করল, আগুন তাকে স্পর্শ করবে না। ***বায়হাকি

হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ বলেন, হে আদম সন্তান, দিনের প্রথম ভাগে আমার জন্য চার রাকাত নামাজ নিশ্চিত করো, আমি দিনের শেষভাগে তোমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাব। ***মুসনাদে আহমদ, খ- ২, পৃ. ৬১২)

চাশত

সময় ও রাকাত সংখ্যাঃ
সূর্য যখন আকাশে এক চতুর্থাংশ ওপরে উঠে এবং সূর্যের তাপ প্রখর হয়, তখন থেকে দ্বিপ্রহরের আগ পর্যন্ত (৯টা থেকে ১১টার মধ্যে) চাশতের সময় চাশতের নামাজের রাকাতের সংখ্যা ২, ৪, ৮, ১২ রাকাত পর্যন্ত হাদীস গ্রন্থে পাওয়া যায়। দুই দুই রাকাআত করে চাশতের নামাজ আদায় করা যায়।
ফজীলত:
সালাতুত দুহা বা চাশতের নামাজ হযরত বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেছেন, মানুষের শরীরে ৩৬০টি জোড়া আছে। অতএব মানুষের কর্তব্য হলো প্রত্যেক জোড়ার জন্য একটি করে সাদকা করা। সাহাবায়ে কিরাম (রা.) বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! কার শক্তি আছে এই কাজ করার? তিনি (সা.) বললেন, মসজিদে কোথাও কারো থুতু দেখলে তা ঢেকে দাও, অথবা রাস্তায় কোনো ক্ষতিকারক কিছু দেখলে সরিয়ে দাও, তবে এমন কিছু না পেলে, চাশতের দুই রাকাত নামাজই এর জন্য যথেষ্ট। ***আবু দাউদ শরীফ, ১ম খ-, ১৮২ পৃষ্ঠা ও মিশকাত শরীফ, ১ম খ-, ১১৬ পৃষ্ঠা।

হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি চাশতের ১২ রাকাত নামাজ আদায় করে তাহলে আল্লাহ্ তা’আলা তার জন্য বেহেশতে স্বর্ণের অট্টালিকা প্রস্তুত করে দেবেন। ***তিরিমিযী শরীফ, ১ম খ-, ১০৮ পৃষ্ঠা ও মিশকাত শরীফ, ১ম খ- ১১৬ পৃষ্ঠা।

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আমার বন্ধু মুহাম্মদ (সা.) আমাকে তিনটি বিষয় আমল করার উপদেশ দিয়েছেন। (১) প্রতি মাসের প্রথম ৩ দিন রোজা রাখা, (২) চাশতের নামাজ আদায় করা, এবং (৩) ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে ভিতরের নামাজ আদায় করা। ***বুখারী শরীফ, তাহাজ্জুদ অনুচ্ছেদ, অধ্যায় দুই হাদিস. ২৭৪ ও মুসলিম শরীফ, কিতাবুস সালাত, অধ্যায় ৪, হাদিস. ১৫৬০।

যে ব্যক্তি নিয়মিত চাশতের নামাজ পড়ে তার আর্থিক অভাব-অনটন থাকতে পারে না, রিজিক বৃদ্ধি হয়। নবী করীম (সা.) মক্কা বিজয়ের দিন দুপুরের পূর্বে উম্মে হানীর গৃহে সংক্ষিপ্তভাবে দুই/দুই রাকাত করে ৮ রাকাত পড়েছিলেন।***তিরমিযী শরীফ, ১ম খ-, ১০৮ পৃষ্ঠা ও আবু দাউদ, ১ম খ-, ১৮২ পৃষ্ঠা।

হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেছেন, সমুদ্রের ফেনার সমান গোনাহ্ হলে মাফ হয়ে যাবে চাশ্তের নামাজ পড়লে। ***তিরমিযী শরীফ, ১ম খ-, ১০৮ পৃষ্ঠা ও ইবনে মাজাহ্, ১ম খ-, ৯৮ পৃষ্ঠা।

আউয়াবীন

সময় ও রাকাত সংখ্যাঃ
মাগরিবের ফরজ ও সুন্নাতের পর ইশার ওয়াক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আউয়াবীনের নামাযের সময়। এ সময়ে নফলের নিয়তে কমপক্ষে ৬ রাকাত এবং ঊর্ধ্বে ২০ রাকাত পর্যন্ত নামায পড়া যায়।
ফজীলতঃ

হযরত আবু হুরায়রা (রাজি.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মাগরিবের নামাজের পর ছয় রাকাত নফল নামাজ পড়বে, এসবের মাঝাখানে কথাবার্তা বলবে না, আল্লাহ্ তা’আলা তার ১২ বছরের নফল ইবাদাত করার ছাওয়াব দান করবেন। ***তিরমিযী শরীফ ১ম খ- ৯৮ পৃষ্ঠা ও মিশকাত শরীফ ১ম খ- ১০৪ পৃষ্ঠা।

হযরত আম্মার বিন ইয়াসীন (রাজি.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মাগরীবের পর ছয় রাকাত আওয়াবীনের নামাজ পড়বে, তার গোনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে, যদিও তার গোনাহ সাগরের ফেনাতুল্য হয়। ***ইবনে মাজাহ, ১ম খ-, ৮১ পৃষ্ঠা।

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মাগরীবের পর বিশ রাকাত নফল নামাজ পড়বে আল্লাহ্ তা’আলা তার জন্য বেহেশতে একটি ঘর প্রতিষ্ঠিত করবেন। ***তিরমিযী শরীফ, ১ম খ-, ৯৮ পৃষ্ঠা ও মিশকাত শরীফ, ১ম খ-, ১০৪ পৃষ্ঠা।
(চলমান……)

পাঠকের মতামত