সড়ক পরিবহন বিল সংসদে উত্থাপন, এই অধিবেশনেই পাস হতে পারে

সড়ক পরিবহন বিল সংসদে তুললেন সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তবে বিলটি আগামী রবিবার সংসদে উত্থাপন করা হবে বলে তিনি জানান।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে ও আইনমন্ত্রীকে ডেকে আলাপ-আলোচনা করে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি নিজেই আজই সড়ক পরিবহন বিল সংসদে তুলতে বলেছেন। কাজেই আমি আইনটি আজই সংসদে উত্থাপন করব। আশা করি এই অধিবেশনের শেষের দিকে আইনটি পাস হবে।”

মন্ত্রী উত্থাপন করার পর বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠান ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা এই আইনটি করার কাজে গতি পায়। নতুন আইনে বেপরোয়া মোটর যানের কবলে পড়ে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।

গত ২৯ জুলাই রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেশে সাড়া ফেলার পাশাপাশি বিশ্বেও আলোচিত হয়েছিল।

ওই প্রেক্ষাপটে গত ৬ অগাস্ট মন্ত্রিসভা আইনটির প্রস্তাব অনুমোদন করে।

দুর্ঘটনায় প্রাণহানির জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি তোলা শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে সেদিন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, দুর্ঘটনা সংক্রান্ত অপরাধের বিষয়ে এই আইনে যাই থাকুক না কেন, মোটরযান চালনাজনিত কোনো দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে কোনো ব্যক্তি আহত বা প্রাণহানি ঘটলে তা ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩০৪ ধারা অনুযায়ী অপরাধ বলে গণ্য হবে।

খুনের অপরাধের জন্য ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। হত্যার উদ্দেশ্য না থাকার পরও মৃত্যু ঘটলে তা ‘অপরাধজনক নরহত্যা’ বিবেচনা করে ৩০৪ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

তবে দণ্ডবিধির কোন ধারায় মামলা হবে- তদন্ত কর্মকর্তা তা সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করবেন বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

বিলে বলা আছে, এই আইনে যাই থাকুক না কেন, মোটরযান চালনাজনিত কোনো দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতর আহত বা নিহত হলে এ সংক্রান্ত অপরাধ দণ্ডবিধির-১৮৬০ এর এ সংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

“তবে দণ্ডবিধির ৩০৪বি ধারাতে যাই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তির বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালনার কারণে সংঘটিত কোনো দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত বা নিহত হলে চালক সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

বিলের ১১৪ ধারায় বলা হয়েছে, এই আইনের অধীন অপরাধের তদন্ত, বিচার, আপিল ইত্যাদির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি (১৮৯৮) প্রযোজ্য হবে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী হত্যা প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

সেই হিসেবে, যে কোনো সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হত্যা প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে; যদিও উত্থাপিত বিলে এ বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি।

বিলের ১০৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানি এই ধরনের অপরাধ করলে ওই কোম্পানির মালিক, পরিচালক, নির্বাহী কর্মকর্তা, ব্যবস্থাপক, সচিব বা অন্য কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবে।

বিলের ৪ ধারাতে বলা আছে, কোনো ব্যক্তির ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে বা মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স ব্যবহার করে পাবলিক প্লেসে গাড়ি চালাতে পারবে না বা চালানোর অনুমতি দেওয়া যাবে না।

৫ ধারায় বলা আছে, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের অনুমতিপত্র ছাড়া কেউ গণপরিবহন চালাতে পারবে না বা চালানোর অনুমতি দেওয়া যাবে না।

৬৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি আইনের ৪ ও ৫ ধারা লঙ্ঘন করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

৬ ধারায় বলা আছে, অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর বয়স কমপক্ষে ১৮ এবং পেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে বয়স কমপক্ষে ২১ হতে হবে। আবেদনকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি পাস হতে হবে। আরও বলা হয়েছে, ড্রাইভিং লাইসেন্স হস্তান্তর করা যাবে না।

বিলে বলা হয়েছে, ফিটনেস সনদ ছাড়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ সনদ ব্যবহার অথবা ইকোনোমিক লাইফ অতিক্রান্ত হওয়া মোটরযান চালালে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।

বিলে বলা হয়েছে, সরকার বা সরকারের অনুমতি নিয়ে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে সারা দেশে বা যে কোনো এলাকার জন্য যে কোনো মোটরযানের সংখ্যা নির্ধারিত করতে পারবে। কোনো এলাকায় মোটরযানের সংখ্যা নির্ধারিত সংখ্যা বেশি হলে অতিরিক্ত মোটনযানকে চাহিদা অনুযায়ী অন্য এলাকায় চলাচলের অনুমতি দেওয়া যাবে।

মোটরযান দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি আঘাতপ্রাপ্ত হলে বা মারা গেলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে বিলে। কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত হারে ও পদ্ধতিতে মোটরযানের মালিক বা প্রতিষ্ঠানের নিকট হতে আর্থিক সহায়তা তহবিলের জন্য বাৎসরিক বা এককালীন চাঁদা আদায় করবে।

আর্থিক সহায়তা তহবিল পরিচালনার জন্য একটি ট্রাস্টি বোর্ড থাকবে। বোর্ড আঘাতপ্রাপ্ত, ক্ষতিগ্রস্ত বা মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীকে দেওয়ার জন্য আর্থিক সহায়তার পরিমাণ নির্ধারণ ও মঞ্জুর করবে।

আইনের উল্লেখযোগ্য দিক

বিদ্যমান আইনের ১১৭টি ধারা ও ১২টি তফসিলের স্থলে ১৪টি অধ্যায়ে ১২৬টি ধারা।

  •  নিরাপদ সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিকরণের জন্য সময় সময়, এক বা একাধিক বিষয়ে আদেশ প্রদান এবং নীতিমালা প্রণয়নের বিধান।
  •  সড়কের ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী ব্যক্তি বা পরিবার বা প্রতিষ্ঠান বা কোন এলাকার জন্য মোটরযান রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা বা সীমা নির্ধারনের বিধান।
  •  প্রতিবন্ধীবান্ধর মোটরযান প্রবর্তন এবং গণপরিবহনে নারী, শারিরীক প্রতিবন্ধী, বয়স্ক ব্যক্তি ও শিশুদের জন্য আসন সংখ্যা নির্ধারণ।
  •  মোটরযান চলাচলে শৃঙ্খলা রক্ষার্থে চালকের সিটবেল্ট বাধা, গাড়ি চালনার সময় মোবাইল ফোন  ব্যবহার না করা, সংরক্ষিত আসনে না বসা, বিপরীধ দিক থেকে মোটরযান না চালানো, যাত্রীদের সাথে সৌজন্যমুলক ব্যবহার ইত্যাদি বিধান।
  •  সরকারি কর্মচারীদের অর্পিত দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা ত্রুটিপূর্ণভাবে পালনের কারণে দূর্ঘটনা ঘটলে বা কোন সড়কের ডিজাইন বা নির্মাণ বা রক্ষনাবেক্ষনজণিত বা তদারকির ওপর বর্তাবে এবং প্রচলিত আইনে বিধান হবে।
  • চালকের রুট পারমিট প্রদান।
  •  যাত্রীদের জন্য বীমা ঐচ্ছিক রেখে তাদের জন্য আর্থিক সহায়তা তহবিল প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি যাত্রী বা তৃতীয় পক্ষ ব্যতিত শুধু মোটরযান বীমা অব্যাহত রাখার বিধান।
  •  টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনয়ন এবং জনস্বার্থে স্বচ্ছ ও চাঁদাবাজিমুক্ত করার বিধান।
  •  সড়ক বা মহাসড়কের পাশে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা হাট-বাজার, দোকানপাটসহ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ বা তাৎক্ষণিকভাবে অপসারণের বিধান।
  •  মোটরযান মালিকদের সুবিধার্থে বিআরটেএ‘র যেকোন সার্কেল হতে ফিটনেস নবায়নের বিধান।
  •  নতুন বা ব্যতিক্রমধর্মী মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন প্রদানের বিধান অন্তর্ভুক্তিকরণ।

পাঠকের মতামত