ভূমিকম্প কি এবং কেন হয়? ভূমিকম্প হলে কি করবেন?

ভুমিকম্প! এমনই একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যার এখনো কোন পূবার্ভাস জানার যন্ত্র আবিষ্কৃত হয় নাই।

প্রথমে জেনে নিই ভূমিকম্প আসলে কি?

ভূমিকম্প যাকে ভূ-কম্পনও বলা হয়ে থাকে। ভূমি বা মাটির নিচে যখন শিলা স্থানচ্যুত হয় তখন ভূমিকম্প হয়ে থাকে। এছাড়া মাটির নিচে অবস্থিত গ্যাস আগ্নেয়গিরির মুখ দিয়ে বা অন্যকোন ভাবে বের হয়ে আসে তখন গ্যাসের অবস্থানটি ফাঁকা হয়ে যায় এতে ভূমির উপরের অংশ ভারসাম্য ধরে রাখার জন্য সেই ফাঁকা স্থান দখল করে নেয়, যার ফলে ভূমি কেঁপে উঠে। আর ইহাকেই আমরা ভূমিকম্প বলে থাকি। ভূমিকম্প মাপার যন্ত্রের নাম হল রিখটার স্কেল।

রিখটার স্কেলে এখন পর্যন্ত সবথেকে বড় ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে ২২ মে ১৯৬০ সালে চিলিতে (৯.৫) মাত্রা। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প ধরা হয়েছে ১৯১৮ সালে (৭.৬) মাত্রা। বাংলাদেশে সবথেকে বেশী ভূমিকম্প হয়েছে চট্টগ্রামে (৪০বার)।

এবার জেনে নিই ভূমিকম্প কেন হয়?

ভূমিকম্পের কেন্দ্র:

পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেখান থেকে ভূকম্প-তরঙ্গ উৎপন্ন হয়, তাকে ভূমিকম্পের কেন্দ্র বলে। এই কেন্দ্র থেকে কম্পন ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গের মাধ্যমে সব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। শিলার পীড়ন-ক্ষমতা সহ্যসীমার বাহিরে চলে গেলে শিলায় ফাটল ধরে ও শক্তির মুক্তি ঘটে। তাই প্রায়শই ভূমিকম্পের কেন্দ্র চ্যুতিরেখা অংশে অবস্থান করে। সাধারণত ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ১৬ কিমি.-র মধ্যে এই কেন্দ্র অবস্থান করে। তবে ৭০০ কিমি. গভীরে গুরুমণ্ডল (Mantle) থেকেও ভূ-কম্পন উত্থিত হতে পারে।

ভূমিকম্পের কারণ:

সাধারণত তিনটি প্রধান কারণে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়ে থাকে।

ভূপৃষ্ঠজনিত:

আমাদের ভূ -পৃষ্ঠ অনেকগুলো প্লেট-এর সমন্বয়ে গঠিত। এই প্লেটগুলো একটি আরেকটির থেকে আলাদা থাকে ফল্ট বা ফাটল দ্বারা। এই প্লেটগুলোর নিচেই থাকে ভূ-অভ্যন্তরের সকল গলিত পদার্থ। কোনও প্রাকৃতিক কারণে এই গলিত পদার্থগুলোর স্থানচ্যুতি ঘটলে প্লেটগুলোরও কিছুটা স্থানচ্যুতি ঘটে। এ কারণে একটি প্লেটের কোনও অংশ অপর প্লেটের তলায় ঢুকে যায়, যার ফলে ভূমিতে কম্পন সৃষ্টি হয়। আর এই কম্পনই ভূমিকম্প রূপে আমাদের নিকট আবির্ভূত হয়।

আগ্নেয়গিরিজনিত:

কখনো কখনো আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ও গলিত লাভা উৎক্ষিপ্ত হবার কারণে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হতে পারে।

শিলাচ্যুতিজনিত:

কখনো কখনো পাহাড় কিংবা উচু স্থান থেকে বৃহৎ পরিসরে শিলাচ্যুতিজনিত কারণে ভূমিকম্প হতে পারে।

ভূপাত:

কোনো কারণে পাহাড়-পর্বত হতে বৃহৎ শিলাখণ্ড ভূত্বকের ওপর ধসে পড়ে ভূমিকম্প হয়। সাধারণত ভাঁজ পর্বতের নিকট অধিক ভূমিকম্প হয়।

তাপ বিকিরণ:

ভূত্বক তাপ বিকিরণ করে সংকুচিত হয়ে পড়লে ফাটল ও ভাঁজের সৃষ্টি হয়ে ভূমিকম্প হয়।

ভূগর্ভস্থ বাষ্প:

নানা কারণে ভূগর্ভে বাষ্পের সৃষ্টি হয়। এই বাষ্প ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলে তা ভূত্বকের নিম্নভাগ ধাক্কা দেয়; ফলে প্রচণ্ড ভূকম্পন অনুভূত হয়। এবং ভূমিকম্প হয়।

হিমবাহের প্রভাবে:

কখনো কখনো প্রকাণ্ড হিমবাহ পর্বতগাত্র হতে হঠাৎ নিচে পতিত হয়। এতে ভূকম্প কেঁপে ওঠে এবং ভূমিকম্প হয়।

ভূমিকম্প হলে কি করবেন?

রেডক্রসের পরামর্শ অনুযায়ী, ভূমিকম্পের সময় আত্মরক্ষার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ‘ড্রপ, কাভার, হোল্ড অন’ পদ্ধতি। অর্থ্যাৎ কম্পন শুরু হলে মেঝেতে বসে পড়ুন (ড্রপ), তার পর কোনো শক্ত টেবিল, ডেস্ক বা নিচে জায়গা আছে এমন শক্ত ও দৃঢ় আসবাবের নিচে আশ্রয় নিন (কাভার)। সেখানে গুটিশুটি হয়ে বসে থাকুন (হোল্ড অন)।

ভূমিকম্প শুরু হলে ধ্রুত ভবন থেকে বেরিয়ে পড়ুন,  ভূমিকম্পের পর পরই আবারও কম্পন হতে পারে, যা ‘আফটার শক’ বা পরাঘাত নামে পরিচিত। তাই লিফট ব্যাবহার করবেন না, সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামুন কিন্তু সিঁড়ির নিচে আশ্রয় নিবেন না।

ভবন ধসে পড়ার সময় ছাদ ধসে পড়লে সেটা যে বস্তুর ওপরে পড়ে, ঠিক তার পাশে একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। এটাকে বলা হয় ‘সেফটি জোন’ বা ‘নিরাপদ অঞ্চল’। তাই ভূমিকম্পের সময় সোফা বা এ ধরনের বড় শক্তিশালী আসবাবের পাশে গুটিশুটি মেরে বসে থাকুন।

বের হওয়া সম্ভব না হলে ভবনের এমন কোনো দেয়ালের পাশে গিয়ে আশ্রয় নিন, যে দেয়ালটি বাইরের দিকে থাকে। যেন সেই দেয়াল ভেঙে আপনাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ভূমিকম্পের সময় অবশ্যই মাথার ওপর এক বা একাধিক বালিশ বা শক্ত কিছু নিয়ে রাখবেন। মাথার চোট বাঁচানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শক্ত কলাম বা বিমের নিচে আশ্রয় নিন।

টিন দিয়ে তৈরি ঘর থেকে বের হতে না পারলে শক্ত খাট বা চৌকির নিচে আশ্রয় নিন।

যদি আপনি গাড়ির ভিতরে থাকেন আশপাশে বড় ভবন নেই এমন জায়গায় গাড়ি পার্ক করুন। কখনো সেতুর ওপর গাড়ি থামাবেন না।

যদি ভবন ধসে আটকাও পড়েন, বেরিয়ে আসার কোনো পথ খুঁজে না পান, আশা হারাবেন না। সাহস রাখুন। সাহস আর আশাই আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবে। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। উদ্ধারকারী পর্যন্ত আপনার চিত্কার বা সংকেত পৌঁছানো যায় কী করে, ভাবতে থাকুন।

২০০৫ সালে নকশা বিবি নামক এক পাকিস্তানী নারী ভূমিকম্পে আটকা পড়ার পর  ৬৩ দিন ধ্বংসস্তূপের নিচে বেঁচে ছিলেন। বাংলাদেশে, সাভারের রানা প্লাজা ধসের ১৭ দিন পর রেশমাকে উদ্ধার করা হয়। তাই যা কিছুই ঘটুক না কেন মনোবল শক্ত রাখুন।

পাঠকের মতামত