মিরসরাই ট্র্যাজেডির সাত বছর: ফুল দিয়ে স্মরণ করলো সর্বস্তরের মানুষ

ইকবাল হোসেন জীবন,মিরসরাই: দোয়া-কুরআনখানি, শোকর‌্যালী আর শ্রদ্ধাঞ্জলীর মধ্য দিয়ে মিরসরাই ট্র্যাজেডিতে নিহত ৪৫জনকে স্মরণ করলো সর্বস্তরের মানুষ। স্মৃতির বেদিতে ফুল দিতে এসে কেঁদেছেন স্বজন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সকলের বাম বুকে শোভা পায় শোকের কালো ব্যাচ। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় স্মৃতির বেদি আবেগ-অন্তিম।

বুধবার (১১ জুলাই) মিরসরাই ট্র্যাজেডির সাত বছর উদ্্যাপনের দিনে মায়ানীর আবুতোরাব স্কুল এলাকা দৃশ্যপট ছিল এমন। যদিও বা সর্বস্তরে শোক আগের চেয়ে কিছুটা মিইয়ে গেছে। তবে সন্তান হারা মা-বাবা আর কাছের স্বজনরা বেদিতে ফুল দিতে গিয়ে বার বার অশ্রুজলে ভিজেছেন।

ওইদিন বেলা সাড়ে ১০টার দিকে স্কুল অভিমুখে নির্মিত স্মৃতির বেদি ‘আবেগ’ এ ফুল দিতে আসেন নবম শ্রেণির ছাত্র শরিফ উদ্দিনের মা সেলিনা আক্তার। বেদির সেলেটে আঁকা নিজের সন্তানের মুখখানি দেখে নিরবে কান্নায় ভিজেছেন তিনি। এর পর একে একে প্রিয় সন্তানের শান্তি প্রার্থনায় বেদিতে ফুল দিতে আসেন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র রাহাত হোসেনের মা ফারুল আক্তার, তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র শাখাওয়াত হোসেনের মা জাহেদা বেগম, ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র আশরাফ উদ্দিনের মা রুশনিয়ারা বেগম। এ কজন ছাড়াও আরও অনেক দুঃখিনি মা ২০১১ সালের ১১ জুলাই দেশের স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় নিজেদের প্রিয় সন্তান হারিয়ে নিঃস্ব-রিক্ত হয়েছেন। অনেকে একমাত্র সন্তান হারিয়ে অস্বাভাবিক জীবন-যাপন করছেন।

ওইদিন আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত কোরআনখানি, দোয়া মাহফিল ও শোক র‌্যালী শেষে স্কুল প্রাঙ্গনে অবস্থিত স্মৃতির বেদি ‘আবেগ’ এ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান সর্বস্তরের মানুষ। এসময় নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী উপস্থিত হন সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি এবং তাঁর মেঝ ছেলে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মাহবুব রহমান রুহেল। পিতা-পুত্র দু’জনে প্রথমেই স্মৃতির বেদি আবেগ এ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে একে একে মিরসরাই উপজেলা আওয়ামী লীগ, উপজেলা পরিষদ, আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজ, আবুতোরাব মাদরাসা, মায়ানী ইউনিয়ন পরিষদ, চট্টগ্রাম উত্তরজেলা ছাত্রলীগ ও মিরসরাই উপজেলা ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন।

বেলা ১১টায় আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণসভা। মায়ানী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম গোলাম সরোয়ারের সঞ্চালনায় ও মিরসরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এম আলাউদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্মরণ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম উত্তরজেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক মাহবুব রহমান রুহেল, যুগ্ম সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিন, মিরসরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আতাউর রহমান, সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান (দায়িত্বপ্রাপ্ত) ইয়াসমিন আক্তার কাকলী, প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী

কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আফছার উদ্দিন, মায়ানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কবির আহম্মদ নিজামী ও আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক জাফর সাদিক প্রমুখ।

প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের এ দিনে ৪৫টি গোলাপ কুঁড়ি ফোটার আগেই অকালে হারিয়ে গিয়েছিল মহাকালের তিমিরে। সেদিন মিরসরাই স্টেডিয়াম থেকে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের খেলা দেখে একটি খোলা ট্রাকে বাড়ি ফিরছিল প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী। পথে সৈদালী নামক স্থানে উল্টে গিয়ে পাশের খাদে পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায় ৩৮ শিক্ষার্থী ও এক গ্রামবাসী। পরে আহত অবস্থায় দীর্ঘ সময় পর্যন্ত হাসপাতালের বেডে মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে আরো ৫ শিক্ষার্থীর বিদায় ঘন্টা বাজে। নিজের ছেলের মৃত্যু হয়েছে ভেবে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যায় এক বাবা। মর্মান্তিক ওই ঘটনায় মোট ৪৫ জনের অকাল মৃত্যু ঘটে। যা স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্ঘটনার একটি।

পাঠকের মতামত