ঘরে বাইরে নারীর জীবন চিত্র ও গল্প | বিডি৩৬০নিউজ

ঘরে বাইরে নারীর জীবন চিত্র ও গল্প

আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!
বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই কবিতায় ফুটে উঠেছে সমাজে নারীদের অবদান।

কিন্তু একদল মানুষ মনে করেন নারী মাত্রই অবলা। যদিও এই অবলারাই সংসারের সদস্যদের জন্য সাত সকালে উঠে সারাদিন পরিশ্রম করে সবার শেষে বিশ্রাম বিরতি নিতে যায়। পুরুষ মানুষ কর্মক্ষম না হলে তাকে বেকার বলা হয়। লেখাপড়া শেষ করে কোনো নারী চাকুরী করে উপার্জন করুক বা না করুক, তাদের কখনো বেকার বলা যায় কী? তাই যে নারীরা কাজের জন্য ঘরের বাইরে না গিয়েও সারাদিন ঘরের মানুষদের কাজের জন্য সময় ব্যয় করেন, তাদের সবলা না বলে কি করে অবলা বলা যায়!

এই তথাকথিত অবলাদের যদি গৃহী নারী বলি তবে, আজকের দিনে গৃহী নারী জীবন আর স্বাধীন জীবনের মাঝে অন্যতম পার্থক্য হলো, মা-শ্বাশুড়ি-বৌ (গৃহী নারী) কখনোই বলতে পারে না ঘরটা একটু সামলাও, আমি মোড়ের মাথায় কালুর দোকান থেকে চা খেয়ে আসছি…! কিংবা সাত সকালে উঠে কোনো পুরুষ সদস্য কি একজন মা, শ্বাশুড়ি  অথবা বাড়ির গিন্নির জন্য এক কাপ ধুমায়িত চা এনে মুখের সামনে ধরে বলে, চিনিটা ঠিক আছে তো? সারাদিনের পারিশ্রমিকবিহীন শ্রমের যাত্রায় নারী জীবনে একজন নারী ২৪ ঘণ্টার কতটুকু সময় শুধু তার নিজের জন্যে রাখে?

কাটাকুটি, রান্নাবান্নার পরে সকলকে পরিবেশনের আগে তারা কি পেট পুরে খেয়ে নেয়? অণু কিংবা যৌথ পরিবারে মাছের মুড়ো, সৌখিন কোনো রান্নার কতটুকু তার শেষ পাতে সযত্নে পরিবেশিত হয়? সারাদিনের পারিবারিক ঝক্কি-ঝামেলা, আবদার, সাংসারিক ঝুট-ঝামেলা সামাল দিতে দিতে ওই মা-শ্বাশুড়ি কিংবা বৌটি নিজেদের শখ পুরণের অবসর পায় তো!

সারাদিনের পারিশ্রমিকবিহীন এসব শ্রমকে আমরা বলি ‘আনপ্রডাক্টিভ’ কাজ। অবশ্য এ কাজের মূল্য তো টাকা অথবা মাইনের মতো গুনতি করা যায় না। তিনবেলা ঠিক সময়ে সকলের খাবারের আয়োজনে কোন পদে এতটুকু নুন কম হল অথবা ঝাল বেশি হলো তো আমরা চিৎকার করে বলে উঠি…এসব কি রেঁধেছো…গলা দিয়ে তো নামানো যাচ্ছে না! অন্য বাকী খাবারগুলো সুস্বাদু হলে অথবা গলা দিয়ে নামতে নামতে সুখের ঢেঁকুর তুললেও কতদিন কতবার সজ্ঞানে তার প্রশংসা করি আমরা! না কি ভেবেই নেই এতে আবার বলার কী আছে! অথচ তোমাদের (যারা চাকুরে) অফিসে বছর শেষে ইনক্রিমেন্ট আছে, মাঝে মাঝে মাইনে বাড়ে। উৎসব ভাতা, ভ্রমন ভাতা এমনকি ভালো কাজের জন্য সেলিব্রেশনও আছে।
সরকারি ছুটিসহ, প্রণোদনামূলক, মেডিকেল আবার ক্যাজুয়াল লিভও আছে। আরো আছে উৎসাহ আর মূল্যায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময় পর পর পদোন্নতি।

আমাদের এই মা-মাসিদের কী আছে বলুন তো? যত বয়স বাড়তে থাকে তাদের কাজ বাড়তে থাকে। দায়িত্ব বাড়ে, কর্তব্য বাড়ে। কম বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে যে নারীরা বসেছে তাদের আকস্মিক নোটিশে বোধের ব্যারোমিটার বাড়াতে হয়। বাপের বাড়ির আদুরে মেয়েটি অন্য বাড়ির মেয়ে হতে পারে কি কখনো! বিয়ের আয়োজনের ঝলমলে আলো, আত্মীয় পরিজনের আনন্দ, হৈচৈ, সোনার কাঁকন-হার, লাল বেনারসি আর হাতে মেহেদী পরা মেয়েটি নতুন পরিচয়ে গিন্নি হবার প্রতিযোগিতায় একটু একটু করে বদলে যেতে থাকে। বদলে যেতে থাকে বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো, স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর উৎসুক মন, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে প্রেক্ষাগূহে ঢুঁ মারা অথবা মায়ের সাথে খুনসুটি আর অভিমানের আয়োজন।

এজন্যই বিয়ের পরে বেশির ভাগ মেয়েকে শুনতে হয় ‘…তুই কেমন বদলে গেছিস’। সেদিনের নতুন বউ একদিন নতুন মুখের জন্ম দেয়, মমতা মাখা ‘মা’ শব্দের ডাক শোনে। একই সাথে মা ডাকের গুরুদায়িত্ব বহন করা শিখতে হয়। সেই নতুন বউ, মা-শ্বাশুড়ি’র কি অসময়ে আকাশ দেখতে ইচ্ছে করে না, একদিন কোনো অসুখ-বিসুখ ছাড়াই সারাদিন অলস সময় কাটাতে ইচ্ছে করে না, ছেলেবেলার কোনো শখ কিংবা গুণ, এতোদিন যার যত্ন করার সময় হয়নি, সেসব আবার নতুন করে সাজাতে ইচ্ছে করে না? প্রতিদিন নিজেদের একঘেঁয়ে রান্না ছেড়ে একদিন রেস্টুরেন্টে খেতে যেতে ইচ্ছে করে না? যেমন করে বাড়ির ছেলেরা, কম বয়সি ছেলে-মেয়ে শখ করে বলে ওঠে একটু ‘চেঞ্জ দরকার’। তেমন করে মা-শ্বাশুড়ি-বৌটি কখনো কী সন্ধ্যেবেলা বলে ওঠে ‘একটু চেঞ্জ দরকার…মোড়ের মাথার রকে বসে অলস আড্ডা দিতে যাই, কালুর দোকানের চা বড্ড ভালো হয় বুঝলে…!’

এবার চাকুরীজীবী নারীর গল্পে আসা যাক-
এই নারীরা ঘরে বাইরে দুই জায়গাতেই দশভূজা হয়ে বিরাজমান। ঘরের মধ্যে আবদ্ধ নারীর তুলনায়  স্বাধীনতার কিছুটা স্বাদ তারা পেয়ে থাকেন। অর্থনৈতিকভাবে উপার্জনের ক্ষমতা আছে বলে পরিবারে তাদের অবস্থান গৃহী নারী অপেক্ষা ভালো। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ তথা ক্ষমতায়নের দিক থেকে তারা যে পুরুষের সমকক্ষ সে কথা অবশ্য জোর দিয়ে বলার উপায় নেই। কর্মক্ষেত্রে একজন নারী যতই দক্ষ ও কর্মিষ্ঠ কর্মী হোক না কেন, হেঁসেলে ও সংসারের খুঁটিনাটিতেও তার পারদর্শিতার কমতি হলে চলে না। এই গিন্নীপনার গুণ বিচারে আবার শুধু পুরুষরাই ব্যস্ত থাকেন তা নয়। প্রায়শই পুরুষতান্ত্রিক নারীকূলও এক ধাপ এগিয়ে যে, নারীরা ভেবেই নেয় নারীজন্ম মানে পৃথিবী বিখ্যাত খ্যাতি অর্জন করলেও ঘরের লক্ষী প্রতিমাকেই ঘরের সৌন্দর্য্য টিকিয়ে রাখতে হয়। এ আসনের ব্যত্যয় হবার নয়। তাই একজন কর্মজীবী নারী তার দিবসে কর্মক্ষেত্রে যাবার আগে ওয়ার্ডরোব থেকে পার্পল রং এর শাড়ি অথবা ড্রেস বেছে নিতে নিতে মনে করেন, যে কিনা নিত্য দিনের কাজের চাপে ঘামে নেয়ে ধুয়ে শুধু হাসিটাই অটুট রাখতে জানে তার আবার এক দিনের পার্পল অথবা ম্যাজেন্ডায় কী বা আসে যায়!

একদল সমালোচক বলেন, সমান অধিকার চাও আবার বাসে-ট্রামে সংরক্ষিত আসনেরও দাবিদার! এদেশে বাসের ৩-৬টি আসন নারীকূলের জন্য সংরক্ষিত থাকে। সেই আসনগুলো হয় উত্তপ্ত ইন্জিনের ওপরে নয়তো ইঞ্জিনের পাশে। মুরগি নয় কবুতরের খোপের মতো ৩টি সীটের বিপরীতে ৪ জনকে বসতে বাধ্য করা হয়। এ যেনো সোনায় মোরা স্বান্তনা। যে নারীকূল তিনবেলা জ্বলন্ত উনুনের আঁচে খুন্তি নাড়ে, তারাই আবার কেন উত্তপ্ত ইঞ্জিনের ওপরে বসতে ‘কেন বিরহে ব্যাকুল হবে’!

ভীড়বাসে ওঠার সশয়ও ছাএী কিংবা কর্মজীবি নারীর শুনতে হয় ‘ওই মহিলা উঠাবি না’। এবার ধরুন মহিলাটি উঠে পড়ল এবং দুপাশের সিটগুলোর মুখোমুখি একটি আসনও পেয়ে গেলো। ভাবছেন কী শান্তি! আমাদের লোকাল বাসগুলোতে বসে থাকা যাত্রীদের তুলনায় দাঁড়িয়ে থাকা যাএীর সংখ্যা বেশি। তবুও মাঝের পথটুকুতে এক ইঞ্চি জায়গা বাড়ানো হয় না কখনো। সুতরাং ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষদের (সকলে নয়, যে পুরুষরা মেরুদণ্ডহীন) স্পর্শ থেকে বাঁচিয়ে চলাটাই ওই আসনে বসা নারীর জন্য বাকী পথে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। মুখে বলা উত্যক্তকারীকে ইভটিজার বলা যায়। কিন্তু যে ব্যবস্থাগুলো অব্যবস্থাপনায় নিত্যদিন আমাদের উত্ত্যক্ত করে চলেছে? সেই বাসে পার্পেল রং এর সজ্জায় সজ্জিত হয়ে নারী দিবসের র‍্যালি করে ফিরতে ফিরতে মনে হয় এভাবে কতটুকু সোচ্চার হওয়া যায়?

পাঠকের মতামত