রাবিতে অর্ধশতাধিক শিক্ষকের মানববন্ধন!

আলী ইউনুস, রাবি প্রতিনিধি:

শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলা ও প্রাণনাশের চেষ্টার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) অর্ধশতাধিক শিক্ষক। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের সামনে এই মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ।

এদিন বেলা সোয়া দশটায় শিক্ষক সমিতি আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ নেয় ৪৩ জন শিক্ষক। পরে একই স্থানে প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ আয়োজিত বেলা ১১টায় মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশ নেয় অর্ধশতাধিক শিক্ষক।

মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান বলেন, জাফর ইকবালের ওপর আক্রমণ শুধু কোন ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়। এটা আদর্শের ওপর আক্রমণ। সে আদর্শ হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ, অসাম্প্রদায়িকতা। জাফর ইকবাল একজন বিজ্ঞানমনস্ক, বুদ্ধিজীবী, লেখক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। আর এই অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে শান্তির ধর্মের অনুসারী হয়ে মানুষকে হত্যা করা হয়! সাম্প্রদায়িক শক্তি, স্বাধীনতা বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধে চেতনার মূল্যবোধ বিরোধী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র যখন খুনের পৃষ্ঠপোষকতা করে, খুনিকে প্রশ্রয় দেয়, পুরস্কৃত করে তখন সেই রাষ্ট্রে খুন তো হবেই। সেখান থেকে বেরিয়ে আসা এত সহজ নয়। এরই ধারাবাহিকতায় জাফর ইকবালের উপরে হামলা করা হয়েছে।

একই মানববন্ধনে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও নাট্যকার মলয় কুমার ভৌমিক বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় দেখেছি ধর্মের ধোঁয়া তুলে মানুষকে হত্যার ফতোয়া দেয়া হয়েছে। এখনও সেই ধর্মের আলোড়নটি সামনে আনা হয়েছে। পার্থক্যটা এই একসময়ে ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষকে বিশ্বাসে নেয়া যেত না কিন্তু এখন মানুষের মস্তিষ্কে বিশেষ করে যুব সমাজের মস্তিষ্কে অনেক বিষ ঢুকিয়ে দেয়া সম্ভব হয়েছে। আমরা আজ যে অবস্থায় এখানে দাঁড়িয়েছি দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বললে ভুল হয়। দেয়ালটা ভেঙে আমরা বহুআগেই অনেক পিছনে চলে গেছি। জাতির বিবেকের যারা প্রতিনিধিত্ব করেন সেইসব জায়গায় যখন আঘাত আসে তখন সাধারণের অবস্থাটা কি হয়? আর আমরা পরিত্রাণের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছি মানববন্ধনে দাঁড়াবো, বিবৃতি দিবো। আমাদের কর্তব্যটি আসলে কোথায়? এই যে কাজগুলি করছি (মানববন্ধন, বিবৃতি) এগুলো কি প্রতিবাদ? আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা হওয়ার দরকার, প্রতিবাদের প্রথম স্থানটি হওয়ার দরকার আমার শ্রেণিকক্ষ। শ্রেণিকক্ষে কি আমরা শিক্ষার্থীদের বলছি সিলেবাসের বাইরে একটু পড়াশোনা করো, দেশের-সমাজের দিকে তাকাও। এ সিলেবাস তোমাদের মানুষ করবে না। এই সিলেবাস তোমাকে পরীক্ষামুখী করবে, সার্টিফিকেটমুখী করবে তথাকথিত ক্যারিয়ারমুখী করবে। এটা ক্যারিয়ারও নয়। আমরা যদি শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকাই দেখবো আমাদের শিশুদেরকে-যুবসমাজকে কোথায় নিয়ে গেছি, এই যে ঘটনাটি ঘটলো (জাফর ইকবালের ওপর হামলা) তিনি তো অন্যদের মতো নন। মানুষের সঙ্গে মিশে কাজ করতে গেলে উপলব্ধি করা যায় সংকটটি কোথায়? এই বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়, পয়ত্রিশ হাজার ছাত্র-ছাত্রী । আমি আমাদের সময়কালের কথা বলছি (সত্তর দশক) যদি এরকম একটি ঘটনা ঘটতো তাহলে সারাদেশের যে কয়টি বিশ্ববিদ্যালয় ওইসময় ছিলো অচল হয়ে যেত, এ ঘটনার প্রতিবাদে সবাই ফুঁসে উঠতো। আমরা এই শিক্ষক সমাজের কতজন এখানে দাঁড়িয়েছি, শিক্ষক সমিতির এখানে কতজন এসেছিলাম, আমরা কতজন ছাত্রকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছি! আমরা পারিনি কারণ শ্রেণিকক্ষের ছাত্রদের বন্ধু মনে করে সম্পৃক্ত করতে পারিনি। আমাদের সাথে তো সবসময় ছাত্র-ছাত্রীদের থাকবার কথা। আমাদের এটা কর্তব্যও। এই কর্তব্য আমরা কতজন পালন করি। আজকে এই বিশ্ববিদ্যালয় একসময় সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের একটি চারণভূমি ছিল, যেটি সারাদেশ স্মারণ করতো। এই সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত ব্যাপার এবং এটি আমাদের একটি কর্তব্যের অংশ। যেটি এ্যাক্টে পরিষ্কারভাবে লেখা আছে। আমরা কতজন শিক্ষক সেই ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে তাদেরকে পথ দেখানোর কাজে নিয়োজিত, আমরা মনে করছি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান মানে আমার কর্তব্য শেষ। আমি অত্যন্ত কষ্টের সাথে বলছি কারণ আমরা প্রত্যেকেই এমন একটা ঝুঁকির মধ্যে আছি যখন তখন জীবনটি উৎসর্গ করার জন্য হয়ত প্রস্তুত থাকবেন।’

অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম বকসীর সঞ্চালনায় মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সুলতান উল ইসলাম, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সুজিত সরকার, প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের আহ্বায়ক অধ্যাপক জুলফিকার আলী প্রমুখ ও আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শিবলী ইসলাম ।

এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি আয়োজিত মানববন্ধনে দর্শন বিভাগের অধ্যাপক এস এম আবু বকর বলেন, পুলিশ কোন মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারে না। একটা সমাজকে নিরাপত্তা দিতে পারে না। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি প্রগতিশীল, সংস্কৃতিমনা হত তাহলে এখানে পুলিশের দরকার ছিল না। সত্যি বলতে আজ আমরা গভীর সংকটে নিমজ্জিত। পুলিশ, মিলিটারি আর অস্ত্রে যদি ভরসা থাকতো তাহলে পাকিস্তান ধ্বংস হতো না। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানীদের কাছে সবই ছিল তারপরও পরাজিত হয়েছিল জনগণের কাছে। আজ ছাত্র-ছাত্রীদের বিরাট একটা অংশ প্রগতিবিরোধী হয়ে গেছে। সংকট এখানেই! এ সংকট নিরসনে ছাত্রসমাজকে প্রগতিশীল ও সংস্কৃতিমনা হতে হবে। একইসঙ্গে সামাজিক জাগরণ তৈরি করতে হবে।

শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিনের সঞ্চালনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, ইমেরিটাস অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক, সমাজকর্ম বিভাগের সভাপতি ছাদেকুল আরেফিন, আইন বিভাগের অধ্যাপক হাসিবুল আলম প্রধান। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধনের আয়োজন করে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, রাজশাহী।

প্রসঙ্গত গত শনিবার (৩ মার্চ) বিকেলে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) মুক্তমঞ্চে ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) ফেস্টিভালের সমাপনী অনুষ্ঠান চলাকালে মাথায় ছুরিকাঘাতের শিকার হন।

পাঠকের মতামত