মাদক কারবারে পুলিশ জড়িত হওয়ার কারণ কি?

মাদকের মরণ ছোবলে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক তাজা প্রাণ। সেই মরণনেশা বন্ধে সরকারের রয়েছে নানামুখী উদ্যোগ। মাদকদ্রব্যের অবৈধ বিস্তার রোধে নানা সংস্থার মধ্যে পুলিশের রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। কিন্তু সেই পুলিশেরই কোনো কোনো অসাধু কর্মকর্তা মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েছেন, পড়ছেন। কেন? এমন প্রশ্নে পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞরা যে মতামত দিয়েছেন, তাতে প্রথমত একটি বিষয় পরিষ্কার অবৈধ অর্থ উপার্জন। কিন্তু শুধুই কি অর্থের জন্য জড়িয়ে পড়ছে পুলিশ? এমন প্রশ্নও থেকে যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ সদর দপ্তরে ত্রৈমাসিক অপরাধ সভায় একটি বিষয় গণমাধ্যমে উঠে এলে বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পায়। ঊর্ধ্বতন একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা মাদক কারবারে পুলিশের কোনো কোনো কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার বিষয় নিয়ে কথা বলেন ওই সভায়। এসপি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা আইজিপির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, রেঞ্জ ডিআইজিরা ওসি পদায়নে ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা করে ঘুষ নেন। আবার পুলিশ সুপাররা এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল পদায়নে ঘুষ নেন। ফলে এই ঘুষের টাকা উঠাতে গিয়ে ওসি ও তার নিম্নস্তরের পুলিশ সদস্যরা মাদক বাণিজ্যসহ নানা অবৈধ কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়েন। ফলে মাদক বাণিজ্য বন্ধ করা যায় না। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, মাদক বাণিজ্য বন্ধ করতে হলে ওসি থেকে নিম্নপদে কর্মরতদের পদায়নে ঘুষের লেনদেন বন্ধ করতে হবে। সম্মেলনে নতুন আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, পুলিশের কোনো সদস্য মাদক কারবারে যুক্ত হলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়ে আসছিলেন।

দৈনিক আমাদের সময়ে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ‘থানায় মাদকের হাট’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর পর ধারাবাহিকভাবে আরও দুটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদন প্রকাশের পর তোলপাড় শুরু হয় জেলা পুলিশ প্রশাসনে। ইতোমধ্যে প্রতিবেদনের সূত্র ধরে প্রাথমিকভাবে দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ তিনজনকে প্রত্যাহার এবং একজনকে আটক করে পুলিশ। স্পষ্ট হয়, মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন অসাধু কিছু পুলিশ কর্মকর্তা। একই সঙ্গে পুলিশের কোনো কোনো সদস্যও জড়িয়ে পড়েছেন মরণনেশা মাদকের বিকিকিনিতে। শুধু পুলিশ নয়, সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কোনো কোনো সদস্যও জড়িয়ে পড়েছেন আটককৃত মাদক বিক্রির অবৈধ কারবারে।

সরেজমিন মাদক নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রথমত টাকার জন্যই মাদকের অবৈধ কারবারে যুক্ত হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে কেউ কেউ অধীনস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে উৎকোচ নিচ্ছেন নিয়মিত। এ ছাড়া বিশেষ আর্থিক সুবিধা নিয়ে ‘তদরকিতেও ফাঁক’ রাখার অভিযোগ রয়েছে ঊর্ধ্বতন কোনো কোনো পুলিশকর্তার বিরুদ্ধে। নৈতিক স্খলনও পেশাদার একজন পুলিশকর্তাকে মাদকের অবৈধ কারবারে যুক্ত করতে পারে।

আরও দেখা যায়, পুলিশের অসাধু কর্তারা যেসব অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন, তার মধ্যে মাদক বিক্রি এবং মাদক কারবারিদের পৃষ্ঠপোষকতা থেকে অর্থ আদায় তুলনামূলক সহজ ও কম ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন অনেকেই। অল্প ঝুঁকিতে বেশি টাকা রোজগারের লোভ থেকেও মাদক বিকিকিনিতে জড়াচ্ছে পুলিশ।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, আটককৃত মাদকদ্রব্য বাজারমূল্যে বিক্রি করছে পুলিশ! তা-ও থানায় বসেই! একজন কর্মকর্তাকে মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করতেও দেখা গেছে।

পুলিশের নতুন প্রধান মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অবশ্য অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতেও দেখা গেছে আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপর তার অনেক কঠোর কথা শোনা যায়। কিন্তু দেখার বিষয় হলো, নতুন আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করতে পারেন। তবে আশার দিক হলোÑ আগে থেকেই একজন ক্লিন ইমেজের পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি রয়েছে তার। তাই অনেকেই ধারণা করছেন, নিজের পরিচ্ছন্ন ইমেজ কাজে লাগিয়ে তিনি মাদক ব্যবসায় যুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে পারবেন। অবশ্য এই কাজটি আইজিপির জন্য নিঃসন্দেহে খুবই কঠিন চ্যালেঞ্জের হয়ে দাঁড়াবে। ইতিমধ্যেই তিনি সারাদেশের মাদক কারবারী, তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দানকারী গডফাদারদের হালনাগাদ তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন।

মাদক ব্যবসায় জড়িত এক পুলিশ কর্মকর্তা বললেন, টাকাই তাদের কাছে মুখ্য। অল্প সময়ে বিপুল টাকার মালিক হতেই এমন পথে পা বাড়াচ্ছেন তারা।

অবশ্য সীমান্তবর্তী জেলায় পুলিশ সুপারের (এসপি) দায়িত্ব পালনকারী কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, অনেক ক্ষেত্রে জেলার সিনিয়র কর্মকর্তাদের অন্ধকারে রেখেই আটকের সঙ্গে সঙ্গে স্পটেই বিক্রি করে দেওয়া হয় মাদকদ্রব্য। মাঠপর্যায়ে মাদক বিক্রির সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে এসআই পদমর্যদার কর্মকর্তাদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।

তবে পুলিশের মাদক ব্যবসায় জড়ানোর বিষয়ে নানা ধরনের কারণ থাকলেও সবাই একটি বিষয়ে একমত পোষণ করছেন। সেটি হলো পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে শতভাগ জিরো টলারেন্স দেখাতে না পারলে মাদকের ভয়বহতা দূর তো হবেই না, বরং বাড়বে।
কার্টেসি: দৈনিক আমাদের সময়

পাঠকের মতামত