বৃদ্ধি পাচ্ছে রেমিট্যান্স প্রবাহ

সমগ্র বিশ্বে বাঙালিদের পদচারণা ক্রমেই বেড়ে চলছে, নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য এটি ভালো খবর। এই মানুষগুলো আমাদের কাছে প্রবাসী বাঙালি হিসেবেই পরিচিত। এদের কেউ কেউ ভালো অবস্থানে থেকে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেলেও অধিকাংশই শ্রমজীবী মানুষ। শ্রমজীবী হলেও তারা আমাদের কাছে অতি সম্মানিত নাগরিকদের একজন। শুধু সম্মানিত নাগরিকই নয়, তারা আমাদের আপনজনও বটে।

বিশ্বদরবারে আমাদের এ শ্রমজীবী মানুষগুলোর দারুণ খ্যাতি রয়েছে। দু’টি কারণে সাধারণত এ খ্যাতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন তারা। বিশ্বস্ততা এবং স্বল্পমূল্যে শ্রম বিক্রি করার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে রীতিমতো বাঙালিদের জয়জয়কার শোনা যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে অপ্রীতিকর কিছু ঘটনা ঘটে থাকলেও তা ধর্তব্যের আওতায় পড়ে না। বিদেশি প্রভুরাও তা মেনে নেন, আর কিছু না হোক বাঙালিদেরকে সহজে ঠকিয়ে দেয়া যায়। বাঙালিদের দেহঝরা প্রতিফোঁটা ঘামের মূল্য গুনে গুনে পরিশোধ করতে হয় না, শুধু দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার অনুমতি মিললেই বাঙালিরা খুশি হয়ে যান। সেটি বুঝেই বিদেশিরা আমাদের শ্রমিকদের কদর করেন। অনেক কঠিন কঠিন কাজ বঙালিদের মাধ্যমে সাধন করেন। ফলে সাধুবাদ পান ঠিকই তবে প্রাপ্যতায় ফাঁকিঝুঁকি থেকে যায়।

আমাদের প্রবাসীরা ট্যাঁকের টাকা খরচ করে পঁইপঁই করে ঘুরতে বিদেশে ভ্রমণে যাননি, যান দৈহিক শ্রমের বিনিময়ে অর্থ উপার্জন করতে। ভিটেমাটি বিসর্জন দিয়ে দালালের খপ্পরে পড়ে নাজেহাল হয়ে তবে বিদেশ পৌঁছেন। সেখানে গিয়েও তারা স্বস্তি পান না। বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলা করে তবে অর্থ উপার্জন করেন। সেই কষ্টার্জিত অর্থ পাঠিয়ে তারা অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন। ব্যাংকের রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখেন। শুধু রিজার্ভ বৃদ্ধি নয় সেই অর্থের অংশীদারিত্ব করেন দেশের প্রতিটি নাগরিককে। যে অর্থ আমাদের কাছে রেমিট্যান্স নামে পরিচিত। যেই রেমিট্যান্স প্রবাহ অব্যাহত না থাকলে আমরা আজ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিতি পেতাম না। পদ্মা নদীর ওপর নিজস্ব অর্থায়নে দীর্ঘসেতু গড়ার কল্পনা করতে পারতাম না। এ ধরনের আরো অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে যা আমরা নিজস্ব অর্থায়নে করতে সক্ষম হয়েছি কিংবা করতে যাচ্ছি আমরা। এসবই সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের প্রবাহের কারণে। যেই রেমিট্যান্স অনেকের কাছে শ্রমিকের ঘামঝরা মুক্তা নামে পরিচিত। অথচ সেই রেমিট্যান্স প্রবাহ গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি বছর বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন কারণেই এটি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সেই তথ্যটি আমরা পরে তুলে ধরছি। তার আগে আমরা জেনে নেই কি পরিমাণ রেমিট্যান্স যোগ হয়েছে দেশে গত দুই অর্থ বছরে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স আসে ১ হাজার ২৭৬ কোটি মার্কিন ডলার, যা গত অর্থবছরের তুলনায় সাড়ে ১৪ শতাংশ কম ছিল। তার আগের অর্থবছরে অর্থাৎ ২০১৫-১৬ সালে রেমিট্যান্স আসে ১ হাজার ৪৯৩ কোটি মার্কিন ডলার। হিসাব মতে, দেখা যায় খানিকটা ঘাটতি রয়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহের। তবে সুখবরটি হচ্ছে সে ভাটায় এখন জোয়ার এসেছে, চলতি অর্থবছরের নভেম্বর মাসে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে এসেছে ১২১ কোটি ৪৭ লাখ মার্কিন ডলার, যা অক্টোবর মাসের চেয়ে ৪ শতাংশ বেশি। দীর্ঘদিন ধরে রেমিট্যান্স প্রবাহ নিম্নমুখীর কারণ অনুসন্ধান করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তারা প্রথমত দায়ী করেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দীর্ঘ অস্থিরতার কারণে তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের চাকরিচ্যুতিসহ আয় কমে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য কম থাকায় প্রবাসীরা অর্থ পাঠাতে গড়িমসি করছেন। তৃতীয়ত, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারের ফলে হুন্ডিওয়ালারা অবৈধভাবে প্রবাসীদের নিকটজনের কাছে টাকা দ্রুত পৌঁছে দেয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এখানে তৃতীয় কারণটি হয়তো মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাদবাকি দুটি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ফলে প্রবাসীদের আয়ের মন্দাভাবে উদ্বিগ্ন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই। তারা বিষয়টা নিয়ে ভাবছেন কিভাবে অতিদ্রুত প্রবাসীদের কষ্টার্জিত টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে সহজভাবে আনা যায়। আমাদের সরকারও এ ব্যাপারে সচেষ্ট। সমূহ জটিলতা কাটিয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যেন দ্রুত প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থ দেশে আনা যায় সেরকম নির্দেশনা দিয়ে কমিটি গঠন করেছেন সরকার। কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, দেশের বাইরে মোবাইলে অবৈধ অর্থ সেবা প্রদানকারী ও হুন্ডি ব্যবসায়ীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। বিদেশ যাওয়ার আগে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ শ্রমিক তৈরি করে কাজ পাওয়ার নিশ্চিত করতে হবে। এ ধরনের মোট ১৭টি সুপারিশ কমিটি করেছে।

কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে পারলে অন্যান্য বাধাবিঘ্নতা পেরিয়ে আমরা আবার লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হব। আমাদের শ্রমিকদের কাজের ধারাবাহিকতা কিংবা সুনাম অক্ষুণœ রাখতে পারলে অচিরেই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে রেমিট্যান্স প্রবাহ। পাশাপাশি সরকার জনশক্তি রফতানি সহায়ক কাজে জটিলতা দূর করতে সচেষ্ট হবেন আরো। বিশেষ করে দালাল এবং পাসপোর্ট গ্রহণে হয়রানি রোধে সহায়ক ভূমিকা নিবেন আশাকরি। এ ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশনের বিষয়টি সরকার আমলে নিতে পারে। ভেরিফিকেশেনের কারণে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয় বটে। সেটি সহজীকরণের পদক্ষেপ নিতে হবে যেমনি, তেমনি ভিনদেশিরা বাংলাদেশের পাসপোর্ট যেন কোনো মতেই গ্রহণ করতে না পারেন সেই বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। এ অজুহাতে যেন আবার দেশের প্রকৃত নাগরিক পাসপোর্ট গ্রহণে হয়রানির শিকার না হন সেটিকে সবার আগে বিচেনায়ও রাখতে হবে। ভিসা সংগ্রহের ব্যাপারেও নজর দিতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীরা যাতে অধিক মুনাফার বিনিময়ে ভিসা হস্তান্তর না করতে পারেন সেবিষয়ে নীতামালা প্রণয়ন করতে হবে। সব ঠিকঠাক থাকলে যেমনি বাড়বে আমাদের প্রবাসীর সংখ্যা তেমনি বইবে রেমিট্যান্স প্রবাহের বসন্ত বাতাস। তাতে করে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার জনশক্তিতে রূপান্তরিত হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

সুত্র: মানবকণ্ঠ

পাঠকের মতামত