মিয়ানমারের প্রহসন

মিয়ানমার কি বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আদৌ ফেরত নেবে—এমন প্রশ্নই ক্রমে জোরালো হচ্ছে। গত বছরের ২৫ আগস্ট সেখানে রোহিঙ্গা নিধন শুরু হয়েছিল। তার পর থেকে দলে দলে রোহিঙ্গা এসেছে বাংলাদেশে। পাঁচ মাস ধরে চলছে আলোচনা। দুই দেশের মধ্যে চুক্তিও হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া শুরুর কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। এখন তারা পরিবারভিত্তিক তালিকা চেয়েছে। শুক্রবার ঢাকায় দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যকার বৈঠকে মাত্র আট হাজার ৩২ জনের তেমন একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে। এদেরও কবে ফিরিয়ে নেওয়া হবে তার ঠিক নেই। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে এসেছে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা। এই হারে এগোলে আগামী ১০০ বছরে এই প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে কি? তার বাস্তব অর্থ দাঁড়ায়—সামান্য কিছু রোহিঙ্গা ফেরত নিলেও বেশির ভাগই ফেরত নেবে না মিয়ানমার। তাহলে বিশ্ব সম্প্রদায়ের এত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কী মূল্য আছে? কেন মিয়ানমারকে বাধ্য করার মতো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না?

কক্সবাজারে পাহাড় কেটে ও বন-জঙ্গল সাফ করে রোহিঙ্গারা যেভাবে খুপরিঘর বানিয়ে বসবাস করছে, সেই দৃশ্য রীতিমতো অমানবিক। তার মধ্যেই এগিয়ে আসছে বর্ষাকাল। ঘটবে পাহাড়ধস, এতে বহু রোহিঙ্গা মারাও যেতে পারে। নিচু এলাকায় বানানো ঘরগুলো ডুবে যাবে বন্যার পানিতে। তখন এরা কোথায় যাবে? এরই মধ্যে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডাব্লিউএফপি) নির্বাহী পরিচালক জানিয়েছেন, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা রোহিঙ্গাদের প্রয়োজন মেটাতে চেষ্টা করছে; কিন্তু এ ক্ষেত্রে দাতাদের আগ্রহ ক্রমেই কমে আসছে। তার অর্থ অদূর ভবিষ্যতে তাদের খাদ্য জোগানোর দায়ও বাংলাদেশকেই নিতে হবে। বাংলাদেশের পক্ষে তা কতটা সম্ভব হবে? তখন কি এই রোহিঙ্গারা না খেয়ে মারা যাবে? আর কক্সবাজারে শুধু যে রোহিঙ্গারাই বিপদে আছে তা নয়, স্থানীয়দের জীবনেও নেমে এসেছে চরম দুর্দশা।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। অসামাজিক কার্যকলাপ বাড়ছে। মাদকের বিস্তার ঘটছে। মানবপাচারকারীদের তৎপরতাও বাড়ছে। এ অবস্থায় প্রস্তুতির নামে মিয়ানমার যে ক্রমাগত কালক্ষেপণের চেষ্টা করছে, তা এখন মোটামুটি স্পষ্ট। এখন বাংলাদেশকে শুধু দ্বিপক্ষীয় সমাধানের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। যত দূর জানা যায়, মিয়ানমারের পরিস্থিতি এখনো রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার মতো হয়নি। এখনো হামলা, হুমকি বিদ্যমান। রোহিঙ্গারা এখনো পালিয়ে আসছে। মিয়ানমারে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো রোহিঙ্গা ফিরে যেতে চাইবে কি? আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতি অনুযায়ী, তাদের জোর করেও পাঠানো যাবে না। তাই বাংলাদেশকে সব বিষয় বিবেচনা করেই এগোতে হবে।

প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ মিয়ানমারকেই তৈরি করতে হবে। রোহিঙ্গাদের জমি-ঘরবাড়ি ফিরিয়ে দিতে হবে। নিরাপত্তাসহ মৌলিক অধিকারগুলোও নিশ্চিত করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমার সরকারের গড়িমসি দূর করে দ্রুত প্রত্যাবাসনে বাধ্য করার কোনো বিকল্প নেই। সেটি শুধু প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমেই সম্ভব। আমরা মনে করি, ভয়াবহ এই মানবিক সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ বিশ্বসম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যাবে।

Agami Soft. - Inventory Management System

পাঠকের মতামত