ঘণ্টায় মাদকের ১১টি করে মামলা! | বিডি৩৬০নিউজ

ঘণ্টায় মাদকের ১১টি করে মামলা!

মাদক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে পুলিশ, স্বীকারোক্তি এসেছে খোদ পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এ শহীদলি হকের কাছ থেকে। মাদককে নতুন জঙ্গি উল্লেখ করে বড় ধরনের অভিযান চাইছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় সংসদে একজন সদস্য মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলে তাকেও হত্যা করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

সরকার ও পুলিশ প্রধানের এই বক্তব্যই বলে দেয় মাদকের বিস্তার কি পর্যায়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে এখন ফেসবুকে বিভিন্ন পেজেও মাদকের অর্ডার নিয়ে তা সরবরাহ করা হয়।

মাদকের ব্যবহার কতটুকু বেড়েছে তার একটি নমুনা দেখা যায় মামলাতেই। ২০১৭ সালে দেশে প্রতি ঘণ্টায় মাদকের মামলা হয়েছে ১১টি করে।

পুলিশ নিজেই স্বীকার করে যে মামলার পরিসংখ্যান দিয়ে মাদকের বিস্তারের ভয়াবহতা বোঝা যাবে না। কারণ মাদক বিক্রি, পরিবহন, সেবনের ঘটনায় মামলা হয় কমই।

পুলিশের মামলার পরিসংখ্যান এও বলছে যে মাদক সংশ্লিষ্ট ঘটনা প্রতি বছর বেড়েই চলেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরেরর হিসাব অনুযায়ী ২০১৩ সালে মাদক আইনে মামলা হয়েছে ৩৫ হাজার ৮৩২টি। পরের বছর মামলা প্রায় সাত হাজার বেড়ে হয় ৪২ হাজার ৫০১টি।

২০১৫ সালে মাদক আইনে মামলা আরও বাড়ে পাঁচ হাজারের মতো। ওই বছর মামলা হয় ৪৭ হাজার ৬৭৯টি। পরের বছর মামলা বাড়ে ১৫ হাজারের বেশি। ওই বছর মামলা হয় ৬২ হাজার ২৬৮টি।

সদ্য বিদায়ী বছরে আগের বছরের তুলনায় মামলা বেড়েছে ২৫ হাজারেরও বেশি। এই বছর মামলা হয় ৯৮ হাজার ৯৮৪টি। অর্থাৎ প্রতি দিন মামলা হয়েছে ২৭১টি। আর ঘণ্টায় ভাগ করলে এটা দাঁড়ায় ১১.২৯টি।

ঢাকা আহছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য খাতের প্রধান ইকবাল মাসুদ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমাদের দেশে যে পরিমাণ মাদক ধরা পড়ে তার চেয়ে বেশি পরিমাণ মাদক বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এর প্রচুর চাহিদাও রয়েছে।’

মাদকাসক্তরা কেবল নিজের বা পরিবারের ক্ষতি করছে না। তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বা জননিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সম্প্রতি ছিনতাইয়ে জড়িত থাকার অভিযোগে শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ জানতে পেরেছে তাদের মধ্যে ৯৯ শতাংশই মাদকাসক্ত। আর মাদকের টাকা যোগাড় করতেই ছিনতাই করে তারা।

এ ছাড়া মাদকের টাকা যোগাড় করতে বাবা মায়ের ওপর আক্রমণ, পুত্র, কন্যা-স্ত্রীকে নির্যাতন , বাড়ির জিনিসপত্র বিক্রি করে দেয়ার মতো অভিযোগ আসে অহরহ। তবে সামাজিক লজ্জার ভয়ে বেশিরভাগ ঘটনাই প্রকাশ পায় না।

আবার খুনোখুনিও বিরল নয়। প্রাপ্তবয়স্ক থেকে শুরু করে কিশোরদের মধ্যেও মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধের উচ্চ হার ভাবিয়ে তুলছে সরকার প্রধান থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকেও।

মাদকের বিজ্ঞাপনও চলছে

গণমাধ্যম বা সামজিক মাধ্যমে মাদকের বিরুদ্ধে প্রচার যেমন আছে, তেমনি মাদক বিক্রেতা বা মাদকসেবীরা নতুনদেরকে আসক্ত করে তুলতে নানাভাবে প্রচার চালায় বলেও জানতে পেরেছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক খোরশেদ আলম ঢাকাটাইমসকে জানান, বিশেষ করে ইয়াবা বিক্রেতারা এই প্রচার চালায়। যেমন কেউ যদি রিকশা চালক হন তাহলে তাকে বোঝানো হয়, ‘একটি ইয়াবা সেবন করলে তুমি সারারাত কাজ করতে পারবে’, ছাত্রছাত্রীদের বোঝাানো হয়, ‘তুমি সারারাত জেগে পড়াশোনা করতে পারবে’। আবার কারও যদি যৌন কর্মে অক্ষম মানসিকতা হয়ে থাকে তাহলে তাকে বোঝানো হয় ইয়াবা সেবনের মাধ্যমে যৌনশক্তি বৃদ্ধি পাবে, একাধিকবার সঙ্গম করতে পারবে।

কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল সম্পর্কে ওই মাদকসেবী থেকে যায় একেবারেই অন্ধকারে। বেশিরভাগ সময় দেখা যায়, মাদকাসক্তি জীবনীশক্তিকে ক্ষয় করে ফেলছে, কর্ম উদ্দীপনা বা ক্ষমতা নিঃশ্বেষ করে ফেলছে, যৌন জীবনেরও চিরস্থায়ী ক্ষতি করে দিচ্ছে।

হাল আমলের দুশ্চিন্তা ইয়াবা

৯০ দশকে মূলত কাশের সিরাপ ফেনসিডিলে আসক্তি নিয়েই উদ্বেগ ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা সরকারে। এর বাইরে গাঁজা, প্যাথিড্রিন, হেরোইন, আফিমের মতো মাদকও সেবন করা হতো, যদিও এই পরিমাণটি অত বেশি না।

তবে ২০০৫ সালের পর থেকে ব্যাপকভাবে ইয়াবা বড়ির আসক্তি উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। অন্যান্য মাদক নিলে তার লক্ষণ কোনো না কোনোভাবে ধরা পড়ে। কিন্তু ইয়াবা বড়ি সেবন করলে ঘনিষ্ঠ কেউও না জানলে বুঝতে পারবেন না ওই ব্যক্তি মাদকাসক্ত।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক খোরশেদ আলম ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমাদের দেশে সবচেয়ে ভয়াবাহ মাদকদ্রব্য হলো ইয়াবা। এই ইয়াবা ব্যবসায়ীরা এমনভাবে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকেন যে কেউ ১০টি ইয়াবা বিক্রি করতে পারলে তাকে দুইটি ইয়াবা বিনামূল্যে দেওয়া হবে। আর যারা ইয়াবা সেবন করে থাকেন অন্য মাদকদ্রব্যে নেওয়ার পর ওই মাদবসেবীর যেসব লক্ষন দেখা যায় ইয়াবাসেবনকারীর সে রকম লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে ইয়াবায় আসক্ত হওয়ার পরে তার পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন। সেক্ষেত্রে ওই মাদকসেবীর পরিবারের তখন আর কিছুই করার থাকে না।’

ঢাকা আহসানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য খাতের প্রধান ইকবাল মাসুদ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘মাদকের মধ্যে আমাদের দেশে হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজার চেয়ে ইয়াবা বেশ জনপ্রিয়। এর কারণ ইয়াবা বহন সেবন সহজেই করা যায়। আবার ইয়াবা সেবনে মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত পরিশ্রম রাত জেগে কাজ করার প্রবণতা তৈরি করে। কিন্তু এর দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের ¯œায়ূকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফলে মানুষ একটি ডিপ্রেশনের মধ্যে ভোগে। এর ফলে মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়।

বাংলাদেশে ইয়াবা পাচার হয় মূলত মিয়ানমার থেকে। ইয়াবার পাচার ঠেকাতে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচির সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে আলোচনাতেও বারবার উঠে আসে বিষয়টি। সুচি নিজেও জানিয়েছেন, ইয়াবার কারণে তার দেশও ভুগছে। তারাও এটি বন্ধ করতে চান।

কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। উল্টো ইয়াবা এখন দেশেই বানানো হচ্ছে এমন প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে এমন একটি কারখানার সন্ধান পেয়েছে র‌্যাব।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা খোরশেদ আলম বলেন, ‘আমাদের দেশে ইয়াবা যেভাবে যত্রতত্র আসছে সেভাবে ধরা পড়ছে না।’

বড় সমস্যা জামিন

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, অনেক সময়ে দেখা যায় একজন মাদক বিক্রেতার বিরুদ্ধে ১৫ থেকে ১৬ টির মত মামলা থাকে। আমরা মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাছে দিচ্ছি পুলিশ তাদের আদালতে পাঠাচ্ছে। ওই মাদক ব্যসায়ীরা আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আবারও মাদক ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে। এভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে কীভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে?’।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে মাদক বিক্রেতাদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি এর ভয়াবহতা সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার বিশেষ করে পারিবারিক সচেতনতার ওপর জোর দিয়েছেন এই মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা খোরশেদ আলম।

একই মত দিয়েছেন আহছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য খাতের প্রধান ইকবাল মাসুদ। তিনি বলেন, ‘সরকার মাদক নিয়ন্ত্রণে সরবরাহকারীদের আইনের আওতায় আনলেও এর ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক মাদকসেবীদের কাছে তুলে ধরে না। মাদকের ক্ষতিকর দিক নিয়েই তেমন প্রচার প্রচারণা নেই। শুধুমাত্র কয়েকটি দিবসেই মাদক নিয়ে কথা বলা হয় পরেই সবাই ভুলে যায়।’

ইকবাল মাসুদ মাদকসেবীদের চিকিৎসার ওপরও জোর দিয়েছেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে দেশে মানসম্মত চিকিৎসালয় বা নিরাময় প্রতিষ্ঠানের অভাব আছে বলে মনে করেন তিনি। এ বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে বলেও মনে করেন আহছানিয়া মিশনের এই কর্মকর্তা।

মাদক নিয়ে সাফল্য দাবি করে না কেউ

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে সাফল্য দাবি করে না কেউ। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক খোরশেদ আলম ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমাদের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর একটি নোডাল এজেন্সি। পুলিশে দুই লাখের মত জনবল থাকলেও আমাদের সাড়ে ছয়শ থেকে সাতশ জন। স্বল্প পরিসরে লোকবল দিয়ে মাদক কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়?’।

গত ৬ জানুয়ারি রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে মাদক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা শিকার করেন আইজিপি এ কে এম শহীদুল হকও। তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে মাদক বহনকারীদের বিরুদ্ধে ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৫৪ মামলা হয়েছে। কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু আইন দিয়ে, মামলা করে মাদক সমস্যার সমাধান করা যাবে না।’

‘প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ইয়াবা আসছে। … হাজার হাজার মৎস্যজীবী নৌকায় করে প্রতিদিন আসে। মাছের পেটে করে, সবজির মধ্য দিয়ে ইয়াবা নিয়ে আসে। এটা বন্ধ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না।’

মাদককে নতুন জঙ্গিবাদ বলছেন প্রধানমন্ত্রী

গত ৯ জানুয়ারি নিজ কার্যালয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে মাদককে জঙ্গিবাদের সঙ্গে তুলনা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘এটা জঙ্গিবাদের মতো আরেক জঙ্গি, এটা একেবারে…আমাদেরকে কঠোর হতে হবে।’

‘মাদকাসক্তি আজকে সমাজকে ধ্বংস করছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীকে আমি আরও তৎপর হতে অনুরোধ করব। মাদক কোত্থেকে আসে, কারা ব্যবহার করে, কারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত, কারা এই মাদকের ব্যবসা করে-এ ব্যাপারে আপনাদেরকে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বহু মেধাবী শিক্ষার্থী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, বহু ছেলেপুলে, একেকটা পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, পরিবারেও ওপর জুলুম, অত্যাচার হচ্ছে।’

তথ্য থাকলে আমাকেও হত্যা করুন: মাইজভাণ্ডারী

প্রধানমন্ত্রী এই বক্তব্য দেয়ার দিনই জাতীয় সংসদে দেয়া বক্তব্যে মাদককে ‘নতুন জঙ্গিবাদ’ আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের দাবি জানান তরীকত ফেডারেশনের প্রধান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী।

এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘কে, কারা এখানে আছেন, আমার জানার বিষয় না। আমি নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান, যদি সরকারের কাছে যদি তথ্য থাকে, আমি এই ব্যবসার সাথে জড়িত, আমাকে হত্যা করুন। ‘আমাকে হত্যা করে হলেও দেশটাকে বাঁচান। দেশটাকে বাঁচানো অত্যন্ত প্রয়োজন। দেশ ছেয়ে যাচ্ছে মাদকে।’

সুত্র: ঢাকা টাইমস

পাঠকের মতামত