রাজনীতিতে কমে এসেছে সহিংসতা

চার বছর আগে রাজনৈতিক কর্মসূচি মানেই ছিল সহিংসতা, পেট্রল বোমা, ভাঙচুর, হামলা, পাল্টা হামলা। তবে সেই পরিস্থিতি পাল্টে গেছে অনেকটাই। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে সহিংসতার বৃত্ত থেকে অনেকটাই বের হয়ে এসেছে বাংলাদেশ।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ এ বিষয়ে বলেন, ‘নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে বহু বছরের সমাজের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। দেশে পত্র-পত্রিকার সংখ্যা বেড়েছে, টেলিভিশন, অনলাইন গণমাধ্যম এসেছে। দ্বিমত প্রকাশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এই পরিবেশটি মূলত একটি উদার গণতান্ত্রিক সমাজে উত্তরণের পথ নির্দেশ করে, অনুদার সমাজ থেকে। আমরা এ রকম একটি পরিবর্তনের মধ্যে আছি।’

গত চার বছরে হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি অকার্যকর প্রমাণ হয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমাদের একটা ধারণা আছে হরতাল দেওয়া মানে জনগণের সম্পৃক্ততা। এটা সব সময় সঠিক নয়।’ 23622129_380474029052561_3020663293530039298_n

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অবশ্য এই পরিস্থিতিতে তাদের বিজয় হিসেবে দেখছে। দলের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিরোধী দলের অসহযোগিতা-ধ্বংসাত্মক রাজনীতি থেকে আমরা দেশকে একটা স্থিতিশীল জায়গায় নিয়ে এসেছি। আমাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আমরা বেশি করেছি।’

আর বিএনটি কখনও সহিংসতার ঘটনায় নিজের দায় নিতে চায়নি। তারা বরাবর বলে আসছে, সরকারই তার বিভিন্ন সংস্থা গিয়ে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালিয়ে বিএনপির ওপর দায় দেয়ার চেষ্টা করেছে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, আন্দোলনের সময় যে সহিংসতা হয়েছে আমরা তার আন্তর্জাতিক তদন্ত চেয়েছি। সরকার সে তদন্তে যায়নি। স্বাভাবিকভাবেই আমরা মনে করি এই সহিংসতায় সরকারের যোগসূত্রতা আছে। কারণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সহিংসতার কোনো প্রয়োজন পড়ে ন।’

দুই দলের নেতাদের বক্তব্য যাই হোক না কেন, চার বছর আগের পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জনমনে স্বস্তিও স্পষ্ট।

আর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, দেশে শান্তিপূর্ণ অবস্থা ফিরে আসায় দেশে অর্থনৈতিক কর্মকা- গতি পেয়েছে।

চার বছর আগে সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের দিনটিতে পরিস্থিতি ছিল দমবন্ধ করা। সরকারের শপথের আগে ও পরে কাজে বের হয়ে বোমায় দগ্ধ হয়েছে মানুষ, পুড়েছে পণ্যবাহী যানবাহন, হামলা হয়েছে সরকারি সম্পত্তিতে। চারপাশে আলোচনা ছিল মানুষের জীবনের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে। কবে থামবে এসব-এ নিয়ে জনজিজ্ঞাসাই ছিল প্রধান।

তবে দশম সংসদ নির্বাচন ঠেকানোর জন্য ডাকা লাগাতার হরতাল ও অবরোধ স্থগিত করার পর সেই পরিস্থিতি থেকে কিছুটা বের হয়ে এসেছিল বাংলাদেশ। আবার দশম সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্তির দিন ডাকা অবরোধ ও পরে হরতালের সময় ফিরে আসে আবার সহিংসতা।

কিন্তু এক পর্যায়ে কর্মসূচি ভেঙে পড়ে বিএনপি-জামায়াত জোটের। আর হরতাল বা অবরোধ প্রত্যাহার না করেই গুলশান কার্যালয় থেকে ঘরে ফিরে যান বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এরপর থেকে রাজনীতিতে সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি বললেই চলে।

এই সহিংতার শুরু হয় ২০১৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলনে যাওয়ার পর থেকে। আর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোট এগিয়ে আসার সাথে সাথে বাড়তে থাকে এর পরিমাণ। আর ২০১৫ সালে বিএনপি-জামায়াতের সরকার পতনের ‘চূড়ান্ত আন্দোলন’ ভেঙে পড়ার পর থেকেই মূলত উন্নতি হতে থাকে পরিস্থিতির।

এর পরের বছর থেকে ৫ জানুয়ারি বা ১২ জানুয়ারিকে ঘিরে রাজনীতিতে শুরু হয় কথার লড়াই। দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একে অপরকে দোষারোপ করে যাচ্ছে।

২০১৭ এবং চলতি বছর ৫ জানুয়ারিতে বিএনপি নেতাদের আগের মতো বক্তব্যও দেখা যায়নি। আর পুলিশের অনুমতি না পাওয়ার পর এই দুই বছর রাজধানীতে কর্মসূচিও দেয়নি দলটি।

আবার ২০১৫ সালের পর বিএনপি বিভিন্ন সময় সমাবেশের অনুমতি চেয়েও পায়নি। এ নিয়ে নানা সময় নানা উত্তেজনাও তৈরি হয়েছিল। তবে ২০১৭ সালের শেষ দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি যেমন পেয়েছে বিএনপি, তেমনি যুক্তরাজ্য থেকে ফেরার পর খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দর এলাকায় সড়কে জড়ো হওয়ার সুযোগও পেয়েছে দলটি।

আবার ২০১৬ সালের শেষ দিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এবং ২০১৭ সালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এবং সবশেষ রংপুর সিটি করপোরেশন ভোটকে ঘিরে বিএনপি প্রচার চালিয়েছে নির্বিঘেœ। আর গত কয়েক বছরের তুলনায় শান্তিপূর্ণ এই ভোটের পর পরিস্থিতি আরও রাজনীতি বান্ধব হয়েছে বলে মনে করেন নাজমূল আহসান কলিমুল্লাহ।

এই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বলেন, ‘রংপুরে শাসকদলের প্রার্থী পরাজিত হয়েছে প্রায় ৯৮ হাজার ভোটে। সেটা শাসক দল মেনে নিয়েছে। এ রকম উদার নৈতিক মনোভাব সরকারের পক্ষ থেকে, শাসকদলের পক্ষ থেকে সম্প্রতি আর কোথাও প্রত্যক্ষ করিনি।’

জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের মনে করেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে ২০১৭ সালের মতো ২০১৮ সালকেও স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রাখতে হবে। আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যেন মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে কোনো ভয়ের সৃষ্টি না হয়। সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

সুত্র: ঢাকাটাইমস

পাঠকের মতামত