কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে করণীয়

ডিম খাব কিন্তু ডিমের কুসুম খাব না। এ রকম ধারণা অনেকের মাঝেই আজও রয়ে গেছে। পুষ্টিবিষয়ক তথ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যের ভিড়ে মানুষ সঠিক তথ্য জানতে আজকাল ব্যর্থ হচ্ছে। প্রকৃত অর্থে আমরা বিভিন্ন ধরনের খাবার খেয়ে থাকি। এগুলোর উপাদান ও কাজে রয়েছে পার্থক্য। ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরল যেমন আছে তেমন ভিটামিনও রয়েছে। তাই একেবারেই বাদ দেওয়াও অনুচিত। আদর্শ খাবার বলতে আমরা সাধারণত দুধ ও ডিমকে বুঝি। তাই এটি বাদ না দিয়ে তার সাথে পরিপূরক খাবার গ্রহণ করতে হবে।

কোলেস্টেরল কি?

কোলেস্টেরল এমন একটি উপাদান যা যকৃত থেকে উৎপন্ন হয় এবং লিপিড নামে বহুল পরিচিত। বিভিন্ন খাদ্যউৎস থেকেও আমরা কোলস্টেরল পেতে পারি। প্রত্যেকটি মানুষের জন্য দৈনিক একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে কোলেস্টেরল প্রয়োজন হয়ে থাকে। কোলেস্টেরল পানিতে অদ্রবণীয় তাই এটি প্রোটিন বা আমিষের সাথে যুক্ত হয়ে রক্তনালিতে চলাচল করে। যখন কোলেস্টেরল আমিষের সাথে যুক্ত হয় তাকে লাইপোপ্রোটিন বলা হয়ে থাকে। সাধারণত যে দুই ধরণের লাইপোপ্রোটিন রয়েছে তা হল HDL বা উপকারি এবং LDL বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরল। LDL কোলেস্টেরল সাধারণত হৃদরোগ ও স্ট্রোকের জন্য দায়ী। যখন ধমনীতে কোলেস্টেরল জমতে থাকে তখন রক্ত চলাচলের রাস্তা সরু হতে থাকে এবং একসময় তা বন্ধ হয়ে যায়। তখন রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের মত মারাত্মক রোগের সৃষ্টি করে। LDL কোলেস্টেরল ধমনীতে কোলেস্টরল জমার জন্য দায়ী। অন্যদিকে HDL কোলেস্টেরল ধমনীয় গাত্রের জমে থাকা ক্ষতিকর LDL কোলেস্টেরল যকৃতে পাঠিয়ে দেয়। যকৃত সেই কোলেস্টেরল ভেঙ্গে ফেলে। এর ফলে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিক থাকে।

যারা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেঃ

কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধিতে অনেক কিছু আবার প্রভাবক হিসেবেও কাজ করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে স্থূল  ও শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় ব্যক্তিদের কোলেস্টেরল বৃদ্ধি হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এছাড়াও ৪০ বছেরের বেশি বয়সী মানুষ এবং বাংলাদেশী, ভারতীয়, পাকিস্তানিদের উচ্চ কোলেস্টেরলের ঝুঁকি অন্যান্য দেশের মানুষের তুলনায় অধিক। এছাড়া বংশগত কারণে অন্যান্য সদস্যদেরও কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি হতে পারে।

উচ্চ কোলেস্টেরলের মাত্রা প্রতিরোধে বা নিয়ন্ত্রণে করণীয়ঃ

কোলেস্টেরলের মাত্রা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আপনার দৈনন্দিন জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। মূলত সঠিক খাদ্যাভ্যাস অধিক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। খাবারের সুষম বন্টন কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে খুবই সহায়ক।

  • শারীরিক পরিশ্রমঃ দৈনিক একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় শারীরিক পরিশ্রম করা খুবই উপকারী। সেক্ষেত্রে চাকুরিজীবীরা দিনের একটি নির্দিষ্টি সময় সাধারণ কিছু ব্যায়াম করতে পারেন। এটি কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস করতে সহায়ক।
  • ধূমপান পরিহারঃ ধূমপান কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধিতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। তাই কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমাতে হলে আপনাকে অবশ্যই ধূমপান পরিহার করতে হবে।
  • স্যাচুরেটেড চর্বি গ্রহণ হ্রাসঃ প্রাণিজ খাদ্যে সাধারণত স্যাচুরেটেড চর্বি থাকে যা কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি করতে কাজ করে। সুতরাং প্রাণিজ খাদ্যের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে।
  • আনস্যাচুরেটেড চর্বি সমৃদ্ধ খাবার বেশি গ্রহণঃ বিভিন্ন ভিটামিন বা উপকারি পুষ্টি উপাদানের কারণে প্রাণিজ খাদ্য যেমন ডিম পুরোপুরি ত্যাগ করা ঠিক না। এজন্য প্রাণিজ খাদ্যের সাথে সাথে আনস্যাচুরেটেড চর্বিসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করতে হয়। এতে করে কোলেস্টেরলের মাত্রা ঠিক থাকে এবং অন্যান্য পুষ্টি চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হয়। বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছ যেমন স্যালমন, বাদাম, অ্যাভোক্যাডো, কুমড়োর বিচি, জলপাই ইত্যাদি আনস্যাচুরেটেড চর্বির ভাল উৎস। এসব চর্বিতে HDL কোলেস্টেরল বেশি থাকে যা LDL কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।
  • বাইরের খাবারের প্রতি নির্ভরশীলতা কমানোঃ বাইরের অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবারের প্রতি নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। অতিরিক্ত ভাজাপোড়ার ফলে ফ্যাট ট্র্যান্স অবস্থায় রূপান্তরিত হয় যা কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি করে। সুতরাং বাইরে বেশি না খেয়ে বাসায় রান্না করা খাবার খাওয়া অধিক উপকারি।
  • পর্যাপ্ত ফলমূল শাকসবজি গ্রহণঃ বিভিন্ন ফলমূল ও শাকসবজিতে পর্যাপ্ত আঁশ রয়েছে যা রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল অর্থাৎ LDL এর মাত্রা কমাতে খুবই কার্যকরী ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে শিম, মটর, বিভিন্ন ধরনের ডাল, ওট, যব ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

লিখেছেন: মোঃ আকতারুল ইসলাম, বিএসসি (অনার্স) খাদ্য প্রযুক্তি পুষ্টিবিজ্ঞান, নোয়াখালী বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

পাঠকের মতামত