লক্ষ্য অর্জনের পথে স্বাধীনতা

বাংলাদেশ কোথায় ছিল, কোথায় এসেছে এবং কোথায় যাচ্ছে? স্বাধীনতাকে বুঝতে হলে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে। যাঁরা তদানীন্তন পাকিস্তানে বসবাস করেছেন, তাঁরা জানেন পশ্চিম পাকিস্তানিরা এ দেশের মানুষকে কতটা মর্যাদা দিত।

পাটের তখন সমাদর ছিল। পাকিস্তানের অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল পাট। অথচ সেই পাট উৎপাদন করে কৃষক উৎপাদন খরচের বেশি কিছু পেত না বললেই চলে। পাটের লাভ পুরোটাই যেত পশ্চিমাদের পকেটে। পাকিস্তানের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণকারী ২২ পরিবারের একটিও পূর্ব পাকিস্তানের ছিল না। সেই রাষ্ট্রীয় অর্থে পশ্চিম পাকিস্তানে উন্নয়ন হতো। ব্রিটিশ আমলের পর নতুন রেলপথ হয়নি, সড়কও ছিল বেহাল। খনন না করায় নদীপথও কমতে থাকে। শিক্ষায়ও তারা ছিল এগিয়ে।

পশ্চিম পাকিস্তানের ছয় কোটি মানুষের জন্য এক ডজনেরও বেশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও পূর্ব পাকিস্তানে সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য ছিল মাত্র তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়। এমনকি খেলাধুলায়ও আমরা ছিলাম পিছিয়ে। জাতীয় ক্রিকেট দলে আমাদের কোনো খেলোয়াড়কে নিত না। জাতীয় ক্রিকেট বোর্ডে সব প্রদেশের সদস্য থাকলেও পূর্ব পাকিস্তানের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। সেই ক্রিকেটে বাংলাদেশ এখন পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে। সরকারি চাকরির ৮৫ শতাংশই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের দখলে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল এমন বৈষম্য।

স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা কী পেয়েছিলাম? ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ভৈরব ও হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ধ্বংসপ্রাপ্ত; কল-কারখানা, রাস্তাঘাট, সেতু-কালভার্ট, এমনকি বাড়িঘরও ধ্বংস বা পুড়িয়ে দেওয়া। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের অর্থ-সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে, রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার কোনো বিমান পাইনি আমরা, সমুদ্রগামী কোনো জাহাজ পাইনি। দুটি বন্দরই ছিল ব্যবহারের অনুপযোগী। জলসীমায় পুঁতে রাখা মাইন পরিষ্কার করতে লেগেছিল দুই বছরের বেশি। প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙিয়ে এগোতে হয়েছে। তার পরও স্বাধীনতাবিরোধীদের ষড়যন্ত্র নানাভাবে অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ক্ষমতায়ও এসেছে স্বাধীনতাবিরোধীরা। সে কারণে সাময়িকভাবে থমকে গিয়েও বাংলাদেশ আবার এগিয়ে চলেছে।

অনেক ক্ষেত্রেই এখন পাকিস্তান বাংলাদেশের পেছনে পড়ে গেছে। ১৯৭২ সালে মাত্র ১৭৫ কোটি টাকার বাজেট করতে হয়েছিল, আজ বাজেট হয় চার লাখ কোটি টাকার ওপর। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ। পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে আমাদের মাথাপিছু আয় এক হাজার ৬১০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে এক লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকায় বাংলাদেশের নিরঙ্কুশ অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৪৭ সাল থেকে ঝুলে থাকা ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়েছে।

শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পার্বত্যাঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরি হচ্ছে। এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কক্ষপথে যুক্ত হতে যাচ্ছে। তৃতীয় সমুদ্রবন্দর হিসেবে পায়রা সমুদ্রবন্দরের যাত্রা শুরু হয়েছে। ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। রেলপথের আধুনিকায়ন হচ্ছে। দেশজুড়ে চার লেনের রাস্তা তৈরি হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। নানা দিক দিয়ে এমন অগ্রগতি শুধু স্বাধীনতারই ফসল। সব ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে রক্তে কেনা সেই স্বাধীনতা আমাদের রক্ষা করতেই হবে।

Agami Soft. - Inventory Management System

পাঠকের মতামত