এখন যৌবন যার, উদ্যোক্তা হওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়

এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়— হেলাল হাফিজের রক্তে আগুন ধরানো কবিতা।

উদ্যোক্তা কি জন্মগত নাকি প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা সম্ভব— এ  বিতর্ক অনেক পুরনো। অর্থাত্ উদ্যোক্তা হতে হলে কি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মেসি, সাকিব আল হাসানের মতো জন্মগত প্রতিভা নিয়ে জন্মাতে হয়? উদ্যোক্তার গুণাবলি কি জিনগত? বংশপরম্পরায় চরিত্রে প্রস্ফুটিত হয়? সেক্ষেত্রে অনর্থক এত প্রশিক্ষণ দিয়ে কী লাভ? সেই বিতর্কে না-ইবা গেলাম। তবে উদ্যোক্তাদের মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়—

সৃজনশীলতাযেকোনো নতুন উদ্যোগ মানেই সৃষ্টি। তাই সৃজনশীল ব্যক্তিরা উদ্যোক্তা হিসেবে ভালো করেন। স্টিভ জবস কলেজ ছাড়ার পর চারুকলায় প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বখ্যাত এনজিওর প্রতিষ্ঠাতার স্বপ্ন ছিল কবি হবেন। কবিতাও লিখতেন। তার মানে কি উদ্যোক্তা হতে হলে কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, চিত্রকর হতে হবে? মোটেও তা নয়। আদতে প্রত্যেক মানুষ সৃজনশীল। কারণ প্রত্যেক মানুষের ‘ডান মস্তিষ্ক’ আছে। ডান মস্তিষ্ক শিল্প, ছন্দ সহায়ক। তার কাজ কল্পনা করা, অনুমান করা, দিবাস্বপ্ন দেখা ইত্যাদি। যদিও অনেকে মনে করেন, একেকজনের মস্তিষ্কের একেকটি দিক অর্থাত্ ডান অথবা বাম কার্যকর থাকে। আসলে মানুষের মস্তিষ্কের দুটো দিকই কাজ করে এবং একই সঙ্গে কাজ করে। তাই আমরা প্রত্যেকে সৃজনশীল হতে পারি। শুধু প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তি। উদ্যোক্তার পুরো ভ্রমণটাই অনির্ধারিত ও অজ্ঞাত। সুতরাং আগে কে কী করেছে বা কীভাবে করেছে, তা খোঁজা বৃথা চেষ্টা। এমন কোনো পদচিহ্ন নেই, যা অনুসরণ করে গন্তব্যে পৌঁছা যাবে। পাহাড় কুঁদে কুঁদে নিজেই নিজের রাস্তা তৈরি করে নিতে হবে।

সংকল্পফেসবুকে ‘চাকরি খুঁজব না চাকরি দেব’ নামে উদ্যোক্তা ও হবু উদ্যোক্তাদের একটি গ্রুপ আছে। উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন সমস্যা, অভিজ্ঞতা নিয়ে সেখানে আলাপ-আলোচনা হয়। কেউ কেউ মাঝে মাঝে পোস্ট দেন, ‘আমার কাছে কিছু (বা এত হাজার বা লাখ) টাকা আছে। কিছু একটা করতে চাই। কী করা যায়, একটু সাজেশন চাইছি।’ যেকোনো উদ্যোগের জন্য অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু অর্থ কখনই উদ্যোগের মূল অনুঘটক নয়। হতে পারে না। কী করতে চাই, কেন করতে চাই— এ ব্যাপারটা নিজের কাছে পরিষ্কার থাকা দরকার। অর্থের ব্যাপার আসবে পরে। ওই কাজটা করার জন্য আরো অনেক অনুষঙ্গ প্রয়োজন; সেগুলো আছে কিনা বিবেচনা করতে হবে। সেই সঙ্গে আসবে অর্থের সংস্থান আছে কিনা বা করা যাবে কিনা সেটা। ধরা যাক, আপনি ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটিনির্ভর একটা ব্যবসা স্থাপন করতে চান। আপনি হিসাব করে দেখলেন, কত টাকা লাগবে। সেই টাকার ব্যবস্থাও আপনি করতে পারবেন। কিন্তু আইওটিতে পর্যাপ্ত দক্ষ লোক নেই। সেই ব্যবসা তো দাঁড়াবে না বা টিকবে না। কিংবা আপনি দেশী-বিদেশী পত্রিকা পড়ে জানলেন, হাইড্রোফনিক্স একটা নতুন ধরনের প্রযুক্তি। বাংলাদেশে জমি কম বিধায় এর যথেষ্ট উপযোগিতা আছে। অর্থের সংস্থান করলেন। কিন্তু হাইড্রোফনিক্সে আপনার দৌড় পত্রিকা পড়া জ্ঞান। বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করলেন। কী করতে হবে, কীভাবে করতে হবে— বিশেষজ্ঞই বলেন। আপনি শোনেন। মাঝে মাঝে মালিকসুলভ উপদেশ দেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটা যে অকার্যকর বা হাস্যস্পদ, বিশেষজ্ঞ সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। বিশেষজ্ঞ তার পরিকল্পনামাফিক ব্যবসা চালান। আপনার কাজ শুধু টাকার জোগান দেয়া। পরের মুখে ঝাল খেয়ে কি উদ্যোক্তা হওয়া যায়?

ঝুঁকি নেয়ার বুকের পাটাব্যবসা মানে ঝুঁকি। প্রকৃত অর্থে প্রত্যেক কাজেই ঝুঁকি আছে। চাকরিতেও ঝুঁকি আছে। কাজের পরিবেশ ভালো নাও হতে পারে। মাস শেষে ঠিকমতো বেতন না পেতে পারেন। মালিক বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দুর্ব্যবহার করতে পারে। কেউ কেউ ভাবেন, ব্যাংকে টাকা জমা রাখা ঝুঁকিবিহীন। কিন্তু ব্যাংক তো দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। ব্যাংকের কোনো অসত্ কর্মী আপনার টাকা নিয়ে জোচ্চুরি করতে পারে। তবে হ্যাঁ, ব্যবসার ঝুঁকি আরো বেশি। কারণ ব্যবসায় লাভের সম্ভাবনাও বেশি। উদ্যোক্তাকে ঝুঁকিটা বুঝতে হবে, পরিমাপ করতে হবে এবং তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে। জেনেশুনে আগুনে ঝাঁপ দেয়া ভালো উদ্যোক্তার লক্ষণ নয়। তবে জীবনে অনেক সময় আসে, যখন সুযোগ সামনে আসা সত্ত্বেও জেনে বুঝে কেউ ঝুঁকি নেন আবার কেউ নেন না। যিনি ঝুঁকি নেন, তিনি ব্যর্থ হতে পারেন। ব্যর্থতা মানে লোকসান। অর্থনৈতিক, শারীরিক, মানসিক। তাছাড়া পরিবার, বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে তিরস্কার টিটকারি শুনতে হয়। আবার সফলতা আনতে পারে গত্বাঁধা নিয়মের বাইরে অভাবনীয় লাভ। সবাই যে একইভাবে লাভবান হন বা হয়েছেন, তা নয়। তবে অনেকে সামান্য কিছু (১০-১২ বা এমনকি ২-৩ হাজার) টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করে ১০-১২ বছরে কোটিপতি হয়েছেন। সত্ পথে অন্য কোনো পেশায় এই বিত্ত অর্জন সম্ভব নয়। এ সম্পদ আহরণের নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেন না। তবে ঝুঁকি না নিলে সেটা তো একেবারেই অসম্ভব। তাই যাদের পছন্দ নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা, উদ্যোক্তাজীবন তাদের জন্য নয়। যারা চান গত্বাঁধা নিয়মের বাইরে কিছু— সঠিক ঝুঁকিটা এড়িয়ে যাওয়াটাই তাদের জন্য বড় লোকসান।

দূরদৃষ্টিসম্পন্নক্রিকেটে যারা ভালো ব্যাটসম্যান, তাদের অনেকেই অন্যদের চেয়ে একটু আগে বল (বা বলের গতিপ্রকৃতি) দেখতে পান। এই আগে মানে সেকেন্ড নয়, ন্যানো সেকেন্ড বোঝায়। এতে তিনি তার কৌশল গুছিয়ে নিতে পারেন। এই আগে দেখার ক্ষমতা কিছুটা জন্মগত কিন্তু চর্চার রয়েছে বিশাল ভূমিকা। অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতা বা হার একজনকে অভিজ্ঞ করে তোলে। পরবর্তীতে একই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে সম্ভাব্য ফলাফল কী হতে পারে তা আন্দাজ করতে পারেন। অনেকে ব্যবসায় ব্যর্থতাকে ভয় পান। সফলতা নিশ্চিত না হলে ব্যবসায় নামতে চান না। কিন্তু এটা সোনার পাথর বাটির মতো। সফলতার নিশ্চয়তা যদি দেয়া যায় তাহলে তো সেটি ব্যবসা নয়। ব্যর্থতা ব্যবসার স্বাভাবিক ফল (সফলতার অন্য পিঠ মাত্র), সেটাকে লোকসান ধরা ঠিক নয়। লোকসান তখনই হয়, যখন সেই ব্যর্থতা থেকে কেউ শিক্ষা না নেয়। অনেক সফল উদ্যোক্তার ইতিহাস ব্যর্থতার আগুনে পুড়ে পুড়ে স্বর্ণ হওয়ার রোমাঞ্চকর কাহিনী। বারবার চেষ্টা করতে করতে হঠাত্ একবার ‘দান’ জিতে গেছেন, ব্যাপারটা কিন্তু তা নয়। ব্যর্থতা তার দৃষ্টি সূক্ষ্ম করেছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা পরিপক্ব হয়েছে। ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে, গাটস ফিলিং। অনেক উদ্যোক্তা বা করপোরেট নেতা বড় বড় সিদ্ধান্ত গাটস ফিলিংয়ের ওপর নেয়। সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য অনেক গাণিতিক সমীকরণ আছে। অনেক সফটওয়্যার পাওয়া যায়, যেগুলো একটা দিকনির্দেশনা দিতে পারে। দিন শেষে সিদ্ধান্তটা নিতে হয় একজনকে মানে উদ্যোক্তাকে। আশ্চর্যজনক হলো, এসব সমীকরণ বা সফটওয়্যার একেকটি একেক রকম ফল দেয়। অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তদাতার জন্য সেটা সহায়তা না হয়ে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে একজন নেতা সিদ্ধান্ত নেন গাটস ফিলিং থেকে। গাটস কী? মস্তিষ্কের উচ্চতর কোনো কোষ? মোটেও না। গাটস মানে পেট। উদ্যোক্তা তার সিদ্ধান্ত কোনো যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারবেন না। তার আন্দাজ, অনুমান বা অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে আসে সিদ্ধান্ত। যেটি নিরন্তর প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্জিত হয়।

বয়সউদ্যোক্তা হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই। কর্নেল স্যান্ডার্স তার কেএফসি ব্যবসা শুরু করেছিলেন ৬২ বছর বয়সে। তবে এটি নিয়ম নয়, ব্যতিক্রম। অধিকাংশ সফল উদ্যোক্তা স্বল্প বয়সে ব্যবসা শুরু করেছেন। এর অনেক সুবিধা আছে। যৌবন মানুষের সবচেয়ে সৃজনশীল সময়কাল। আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে/ মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে/ মোর টগবগিয়ে খুন হাসে। যে উদ্যোক্তা যত সৃজনশীল, তিনি তত ভিড়ের বাইরে আলাদা হতে পারবেন। তাছাড়া যৌবনে সহজেই ঝুঁকি নেয়া যায়। বৈষয়িক চিন্তা বা পিছুটান কম থাকে। পরিবারের দায়বদ্ধতা থাকে না বা কম থাকে। যৌবনে লাইফস্টাইলও অনেক সহজ। সাইকেল, বাস, টেম্পোতে চড়া যায়। পকেটে পয়সা না থাকলে হেঁটেও চার-পাঁচ কিলো যাওয়া যায়। অনেকে চিন্তা করেন, কিছুদিন চাকরি করে অভিজ্ঞতা ও টাকা জমিয়ে তারপর উদ্যোক্তা হবেন। সেক্ষেত্রে সামাজিক, মানসিক, অর্থনৈতিক অনেক বাধা তার সামনে এসে দাঁড়াবে। পরিবার বা প্রতিবেশী নিরন্তর জানতে চাইবে— ‘চাকরি কেন ছাড়লেন?’ ‘ছাড়লেন না চাকরি গেল?’ সর্বশেষ প্রাপ্ত বেতনের নিচে নিজের বেতন নির্ধারণ করা মানসিকভাবে কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। অফিসের গাড়ি বা এসি রুমে অভ্যস্ত হয়ে গেলে রিকশা বা নন-এসি রুম মানসিক পীড়া দেবে। তাই যুদ্ধে যেতে হলে লাগেজ বড় হওয়ার আগেই নেমে যাওয়া ভালো। যুদ্ধে (উদ্যোক্তাজীবন) যদি যেতে চান, হে যুবক, এখনই সময়।

Agami Soft. - Inventory Management System

পাঠকের মতামত